প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কোনও প্রকারের পরীক্ষা ছাড়াই রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ১৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চাকরি নিতে প্রতিষ্ঠানটিকে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের অধীন বিভিন্ন পদে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই প্রার্থী নির্বাচন বাস্তবায়িত হয়েছে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ব্যাপারে প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্য অনুসারে, নিয়োগপ্রাপ্ত অধিকাংশ কর্মীই এর আগে নির্বাচন অফিসে দৈনিক মজুরি বা অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত ছিলেন। পরে ঘুষের বিনিময়ে তাদের পূর্বের কর্মস্থলে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে নতুন চুক্তির আওতায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের জন্য কোনো উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কাজ দেওয়া হয়েছে কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডকে।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ডিপিএম আসলে একটি ব্যতিক্রমধর্মী পদ্ধতি। বিশেষ পরিস্থিতিতে কিংবা জরুরি প্রয়োজন হলেই সাধারণত এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এখানে ১৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে মূলত কী জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা করা হয়নি। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীরা আবেদন করার সুযোগই পাননি।
রুমা সিকিউরিটি সার্ভিসেস (প্রা.) লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি চলাকালে প্রাথমিকভাবে ৫ জন গাড়িচালক, ৬৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ৪৩ জন নিরাপত্তাপ্রহরীসহ মোট ১১৭ জনকে নিয়োগ দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল। পরে তালিকায় ২৬ জন নিরাপত্তাপ্রহরী যুক্ত হলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৩।
নথি অনুযায়ী, রাজশাহী নির্বাচন অফিসের অস্থায়ী কর্মীদের বেশিরভাগের চুক্তির মেয়াদ ছিল গত ৩০ জুন পর্যন্ত। এর আগে ১৪ জুন নির্বাচন কমিশন সচিবালয় একটি নির্দেশনা প্রেরণ করে। সেখানে বলা হয়, চলমান চুক্তির মেয়াদ শেষে নতুন করে সেবা নিতে হবে। সেক্ষেত্রে আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ অনুসরণ করে কাজ করা হবে। নির্দেশনার পর ডিপিএম পদ্ধতিতে কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডকে কাজ দেওয়া হয়।
তবে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, চাকরি স্থায়ী থাকবে এবং ভবিষ্যতে বাদ দেওয়া হবে না-এমন আশ্বাসে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করা হয়। যদি জনপ্রতি গড়ে ৭৫ হাজার টাকা হিসাব করা যায়, তাহলে ১৪৩ জনের কাছ থেকে নেওয়া টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন কেএসএফের নিয়োগ বাণিজ্যের কথা। একজন জানিয়েছেন, 'চাকরি স্থায়ী থাকবে এবং ভবিষ্যতে বাদ দেওয়া হবে না-এমন আশ্বাসে আমাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালে তিনি উলটো কোপানির লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে বাধ্য হয়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে চাকরি নিতে হয়েছে।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আর এক কর্মী জানিয়েছেন, 'পুরো সিস্টেম ছিল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচন কর্মকর্তারা সরাসরি টাকা না নিলেও কোম্পানির সঙ্গে তাদের যোগসাজশ ছিল বলেই আমাদের ধারণা। কারণ যারা টাকা দেয়নি, তাদের অনেকের চাকরি হয়নি।'
১৪৩ জন আাউটসোর্সিং তালিকাভুক্ত চাকরিপ্রত্যাশীদের গত ৬ জুলাই নিয়োগপত্র নিতে ডাকা হয়েছিল কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডের শ্যামলী কার্যালয়ে। সেখানে গেলে নিয়োগপত্রের বিনিময়ে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা চাওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে চাকরিপ্রত্যাশীরা অফিসের সামনে সড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমানের দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে লেনদেনের বিষয়ে তিনি অবগতি রাখেননি। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ডিপিএম একটি ব্যতিক্রমধর্মী পদ্ধতি। সাধারণত বিশেষ পরিস্থিতি, জরুরি প্রয়োজন কিংবা আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আমরাও সেটিই করেছি। জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেড আমাদের তিনটি অঞ্চলে কাজ করছে। সবকিছু বিবেচনা করে তাদের কাজ দেওয়া হয়েছে।'
এ বিষয়ে কেএসএফ ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেছেন, 'আমাদের প্রতিষ্ঠানের আগের টেন্ডারের মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে। পুনরায় ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গেলে নিয়োগ সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতো। এতে নির্বাচন অফিসের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল এবং কর্মরত শ্রমিকদের কয়েক মাস বেতনহীন থাকার সম্ভাবনা ছিল। তাই অফিসের গতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে সরাসরি নিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করে বিদ্যমান কর্মীদের বহাল রাখা হয়েছে। এখানে আমাদের হাতে কিছু নেই। নির্বাচন কমিশন জনবল চেয়েছে, আমরা দিয়েছি।'
ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মো. শামীম হোসেন বলেছেন, 'নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা আমরা তৈরি করিনি। রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান স্যার ৩০ জুন আমাদের একটি তালিকা দিয়েছেন। সেই অনুযায়ী চুক্তি হয়েছে। যেহেতু কোনও নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হয়নি এবং পুরনো কর্মীরাই তাদের পদে বহাল আছেন, তাই টাকা নেওয়ার সুযোগ বা কারণ নেই। তবে প্রতিষ্ঠানের অগোচরে ব্যক্তিগতভাবে কেউ টাকা নিয়ে থাকলে তার দায় প্রতিষ্ঠানের নয়।'
ঢাকায় শ্যামলীতে কেএসএফের কার্যালয়ের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের বিষয়ে শামীম হোসেন বলেন, 'একদিনে সব নিয়োগপত্র দেওয়া সম্ভব ছিল না। কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এছাড়া রাজশাহীর স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতা তাদের পছন্দের ২০-৩০ জনকে ওই তালিকায় ঢোকানোর জন্য অনৈতিক চাপ দিচ্ছিলেন। তবে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত তালিকার বাইরে নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ না থাকার কারণে হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে।'
নিয়োগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না থাকার বিষয়টা, ডিপিএম পদ্ধতি ব্যবহারের যৌক্তিকতা এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত বলেও মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, 'এটি ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। যেহেতু দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারণ, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তাই এই প্রতিষ্ঠানে কোনও ধরনের অনিয়ম হলে দোষীদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন