প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যশোরের ভৈরব নদী খননে পৌনে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও এখনও ন্যূনতম সুফল মেলেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত সেতু ও কালভার্টের কারণে নদীতে জোয়ার-ভাটা ফেরেনি। বরং নৌযান চলছে না। উল্টো কচুরিপানা ও ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে নদী। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে বারবার তাগিদ দিয়েও মিলছে না কোনো প্রতিকার।
জানা যায়, গঙ্গা থেকে উৎপত্তি হয়ে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও খুলনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে ঐতিহাসিক ভৈরব নদ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত বাঁধ, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পাশাপাশি অবৈধ দখলে নদী একসময় নাব্যতা হারিয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দাবির মুখে, মৃতপ্রায় ভৈরব নদীতে জোয়ার-ভাটা ফেরাতে খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।
২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি যশোরের চৌগাছা থেকে অভয়নগরের আফরাঘাট পর্যন্ত ৯৬ কিলোমিটার নদী খননের কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালে শেষ হওয়া প্রকল্পে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৭৯ কোটি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু বিপুল এই ব্যয়ের পর নদীজুড়ে এখন কেবল কচুরিপানা আর ময়লার ভাগাড় দেখা যাচ্ছে।
কেবল ময়লা-আবর্জনা নয়, খননের পরও এই নদীকে ঘিরে রয়েছে বাঁধ, অপরিকল্পিত কালভার্ট ও ব্রিজ। কিন্তু খননের আগে নদীতে জোয়ার-ভাটা ফেরানোর এবং নৌযান চলাচলের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। অথচ তার কোনো কিছুই বাস্তবে ঘটেনি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে যে, সঠিক পরিকল্পনার অভাবের কারণে পুরো উদ্যোগটি ভেস্তে গেছে।
যশোর সদর উপজেলার নূরপুর এলাকার বাসিন্দা আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, 'তিন-চার বছর হয়েছে আমাদের এই নদী খনন হয়েছে। কিন্তু জোয়ার-ভাটা আসে না। এমনকি পানিও সরে না। বিশেষ করে ছোট ছোট কালভার্টের কারণে নদী কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। এই জায়গায় একটি ব্রিজ হওয়ার কথা, কিন্তু সে ব্রিজটাও হচ্ছে না। সরকারি লোকজন কোনো কাজই করছে না।'
নওদাগাঁ গ্রামের এস এম সোহেল জানান, 'আমাদেরকে যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, এ নদীতে জোয়ার-ভাটার একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে—কিন্তু আমরা বাস্তবে তার কোনো কিছু দেখতে পারলাম না। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের। সরকারি দফতরগুলো সমন্বয় করে কাজ না করায় রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা গচ্চা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেছেন, 'আমরা দেখছি যে পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, উপজেলা পরিষদসহ যে সব সরকারি দফতর সমন্বয় করে এই নদী খননের বিভিন্ন প্রকার সমস্যা দূর করবে, সে সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করেনি। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে একটি বাঁধ দেয়া হয়েছে। বাঁধটা কিন্তু কয়েকটি জায়গায় একটি মাত্র নয়, নদীর অসংখ্য জায়গায় এ ধরনের বাঁধ দৃশ্যমান। এখানে দুটো ছোট কালভার্ট রয়েছে। এখান থেকে পানি সঠিকভাবে প্রবাহিতও হচ্ছে না। ইতোমধ্যে একটি কালভার্ট ভেঙে পড়েছে। জনসাধারণ এখানে চলাফেরা করতে গিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছে। আমি চাই সরকারি দপ্তরগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করুক। তাহলে এই নদী খননের সঠিক সুফল পাওয়া যাবে।'
ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য তসলিমুর রহমান জানিয়েছেন, 'দীর্ঘকাল ধরে যশোরবাসীর আন্দোলনের পর ভৈরব নদ খনন হয়েছে। কিন্তু খননের মূল দাবি, উজানে নদীর সংযোগ, তা এখনও পূরণ হয়নি। খননের সময় এই ভৈরবের ওপরে চিহ্নিত ৫৩টি সংকীর্ণ সেতু অপসারণ করা হয়নি। যেমন আমাদের দড়াটানা, কাঠেরপুল ব্রিজ। এর ফলে ৮টি সেতু নির্মাণের কারণে মামলা হয়েছে এবং জনগণ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেছেন, 'খননের সময় নদীর তীর উদ্ধার ও দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়নি। সবমিলিয়ে ভৈরবের যে পরিপূর্ণ সুফল পাওয়া উচিত, তা আমরা এখনো উপভোগ করছি না। এই সুফল পেতে হলে উজানে নদী সংযোগ দিতে হবে, সংকীর্ণ সেতুগুলি উৎখাত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে নির্মিত হবে তাও নদীমারা সেতু যাতে না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন আছে। তাহলেই ভৈরব নদ পুনরুদ্ধার হবে।'
ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন কমিটির নেতা জিল্লুর রহমান ভিটু জানিয়েছেন, 'যশোরবাসীর দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভৈরব নদ খনন জন্য ২৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু সে টাকার অনেকটাই হরিলুট হয়েছে। খননের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে নদীর দুই পার খনন হয়েছে, মাঝখানে বুক উঁচু। আরও বড় সমস্যা হল স্থানান্তরের জন্য উজানে নদী সংযোগ করা হয়নি, ফলে খনন কার্যকর হচ্ছে না।'
তিনি বলেছেন, 'একটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় নেই। সংকীর্ণ কালভার্ট এবং সেতুর কারণে খনন কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে। এর পরেও খনন প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে আমাদের নদীর যে খরস্রোতা আইন, সেটি পালন করা হয়নি। স্বাভাবিক কারণে খননের তেমন কোনো কার্যকরী ভূমিকা নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা মনে করি যে নদীর খরস্রোতা আইন মেনে নদীকে রক্ষা করতে উজানের মাথাভাঙ্গার সঙ্গে নদী সংযোগ করে জোয়ার-ভাটা তৈরি করার প্রয়োজন। তাহলেই ভৈরব নদীর গুরুত্ব দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ছোট ছোট খাল এবং পুরো সুন্দরবনে থাকবে। এটি কারণ ভৈরব নদী এই অঞ্চলের প্রধান নদী। এজন্য উজানের মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযোগ এবং খরস্রোতা আইন বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি এবং এ মুহূর্তেই দরকার।'
এই বিষয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেছেন, 'আমরা স্বীকার করছি নদীর ওপর যে অপরিকল্পিত কিছু ব্রিজ ও কালভার্ট রয়েছে, সেগুলোর কারণে নদী আবার ভরাট হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে আমরা সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছি না। ভৈরবের ওপর সবচেয়ে বেশি স্থাপনা এলজিইডির। তারা কিছু উদ্যোগ নিলেও নানা কারণে তা থমকে আছে।'
তিনি আরও বলেন, 'যদি দ্রুত এসব স্থাপনাগুলো অপসারণ করা না হয়, তাহলে যশোর শহরের দড়াটানা থেকে চৌগাছার তাহেরপুর পর্যন্ত ৫৭ কিলোমিটার নদী তার সম্পূর্ণ কার্যকারিতা হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।'
এ বিষয়ে এলজিইডি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, 'ভৈরব নদীর ওপর এলজিইডি, সড়ক ও জনপথসহ বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের অনেকগুলো স্ট্রাকচার আছে। এলজিইডির স্ট্রাকচারের মধ্যে আমাদের বর্তমানে বসুন্দিয়া ব্রিজ নির্মাণ জন্য ইতোমধ্যে টেন্ডারে চলে গেছি। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছি। আর বাকি স্ট্রাকচারগুলো পুনরায় সার্ভে করে সঠিক ডিজাইন এবং ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স রেখে ডিজাইন করার প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতে আমরা প্রকল্পের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।'
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, ভৈরব নদীর ওপর মোট ৫৪টি অপরিকল্পিত কালভার্ট ও ব্রিজ রয়েছে। এর মধ্যে এলজিইডি'র ২৬টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৪টি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের ১৯টি, রেলওয়ের একটি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের একটি এবং বিএডিসির তিনটি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন