প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন জার্মানির ফুটবলার ক্রিস্টোফ ক্রেমার। ছবিটি সংগৃহীত।
খেলা চলাকালীন সময়ে তিনি রেফারি নিকোলা রিজ্জোলিকে প্রশ্ন করেন, ‘এটা কি (বিশ্বকাপ) ফাইনাল?’
রেফারি বরাবর মনে করেন, ক্রেমার তাঁর সঙ্গে মজা করছেন, তাই তিনি আবার প্রশ্নটি শুনতে চান।
ক্রেমার তখন আরেকটু জোর গলায় বলেন, ‘আমি জানতে চাইছি এটা কি ফাইনাল, নাকি অন্য কোনো ম্যাচ?’
এবার রিজ্জোলির এক কথার উত্তর আসে, ‘হ্যাঁ।’ ক্রেমার কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। এটা জানা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
ক্রেমার আবার খেলা চালিয়ে যান। কিন্তু ইতালিয়ান রেফারি রিজ্জোলি কিছুটা সময় পর বুঝে যান যে কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জার্মান ডাগ আউটে বিষয়টি জানান।
এরপর ফিজিওরা এসে ক্রেমারকে মাঠের বাইরে নিয়ে যান।
ফাইনালের ৩১ মিনিটে মাঠ ছাড়েন ক্রিস্টোফ ক্রেমার। ছবিটি ফিফার।
বাস্তুবিকভাবে, ২৩ বছর বয়সী ক্রেমার, যিনি জার্মানির ২৩ নম্বর জার্সি পরে খেলছিলেন, তাঁর বিশ্বকাপ ফাইনাল সেখানে শেষ হয়ে যায়। ম্যাচের আধাঘণ্টা পেরিয়ে গেছে তখন।
বিশেষ করে কোন ফাইনালের কথা বলা হচ্ছে এটা জানেন? ১৩ জুলাই ২০১৪, মারাকানা স্টেডিয়াম, রিও ডি জেনেইরো, আর্জেন্টিনা-জার্মানি বিশ্বকাপ ফাইনাল।
সেই রাতে অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে মেসি ও মাসচেরানোদের ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিরে সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ১১৩ মিনিটে মারিও গোটজের জোড়া গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানি চতুর্থবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়।
৩১ মিনিটে ক্রেমারের বদলে নামা আন্দ্রে শুর্লের ক্রস থেকেই গোটজ গোলটি করেন।
তাহলে, ফাইনালের রাতে ক্রেমারের সঙ্গে কি এমন হয়েছিল যে রেফারির কথায় তাঁকে তুলে নিতে বাধ্য হন জার্মান কোচ ইওয়াখিম ল্যোফ? চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ক্রেমার খেলা চলাকালীন সময়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। মাঠে থাকা অবস্থায় তিনি কিছুই মনে করতে পারছিলেন না।
ম্যাচের ১৭ মিনিটে আর্জেন্টিনার সেন্টার ব্যাক এজেকিয়েল গারাইয়ের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে ক্রেমার মাথায় আঘাত পান। এরপর মাঠে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। ফিজিওরা ভেবেছিলেন, ক্রেমার ঠিক আছেন; তাই যাতে খেলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পান। তবে পরে বোঝা যায়, তিনি আসলে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।
মারাকানায় ফাইনালের রাতে শুরুর একাদশে ক্রেমারের থাকার কথা ছিল না। ম্যাচ শুরুর মিনিট কয়েক আগে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সামি খেদিরা চোট পেলে ক্রেমারকে কোচ ল্যোফ জানান, ‘প্রস্তুত হও, তুমি খেলতে নামছো।’
ক্রেমার তাঁর ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় ধরে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেছেন। এবার তাঁকে শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গোলের জন্য ফরোয়ার্ডদের বল জোগানো তো সহজ কাজ নয়।
ক্রেমার ফাইনালে পুরোটা সময় খেলতে পারেননি ঠিকই; কিন্তু স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেললেও দেশের প্রতি তাঁর নিবেদন সত্যিই একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ের পরদিন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে ফাইনালের রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমি ম্যাচের খুব বেশি কিছুই মনে করতে পারি না। প্রথমার্ধের কিছুই আমার মনে নেই। মাঠ ছাড়ার পর কিভাবে ড্রেসিংরুমে পৌঁছালাম, সেটাও মনে নেই। আমার মনে হয়েছে, ম্যাচটি দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু হয়েছে।’
কয়েক দশক ধরে জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াড বলার মানে হলো বায়ার্ন মিউনিখ ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের খেলোয়াড়দের আধিক্য। তাই বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট ক্লাবের ফুটবলার হিসেবে ইওয়াখিম ল্যোফের নজর কাড়ার জন্য ক্রেমারের জন্য এটি মোটেও সহজ ছিল না।
বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে ক্রিস্টোফ ক্রেমার।
জার্মানির সোলিঙ্গেন শহরের প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ দলে জায়গা পান ক্রেমার। পরবর্তীতে তিনি সেই শহরের প্রথম এবং একমাত্র বিশ্বজয়ী হন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, পেশাদার ক্যারিয়ারে তিনি একটিই শিরোপা জিতেছেন—বিশ্বকাপ। কিন্তু তার স্মৃতি তাঁর খুব বেশি মনে নেই।
২০১৬ সাল থেকে জার্মানি জাতীয় দলে আর কখনো ডাক পড়েনি ক্রিস্টোফ ক্রেমারের। ক্লাব ফুটবল খেলেছেন ২০২৪ সাল পর্যন্ত। সেই বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখে ১১ মৌসুম কাটিয়ে তিনি চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করেন। এরপর অন্য কোনো ক্লাব তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। তাই তিনি গত বছরের জুনে অবসরের ঘোষণা দেন।
নিজের লেখা বই হাতে ক্রিস্টোফ ক্রেমার।
বর্তমানে ৩৫ বছর বয়সী ক্রেমার কাজ করছেন ফুটবল বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে। পাশাপাশি তিনি পডকাস্ট উপস্থাপনাও করছেন। এই সুযোগে তিনি একটি বইও লিখেছেন, যার জার্মান ভাষায় নাম ‘ডাস লেবেন ফিং ইম জোমার আন’ (বাংলা অর্থ জীবন শুরু হয়েছিল গ্রীষ্মকালে)।
বিশ্বকাপজয়ী অনেকেই নিজেদের কিংবদন্তির কাতারে নিয়ে গেছেন, অনেকে পারেননি। অনেকের নাম বিশ্বফুটবল মনে রাখেনি। ক্রিস্টোফ ক্রেমারের নাম সেই তালিকায় উঠে যেতে পারত। কিন্তু ওই একটি ঘটনার কারণে তা হয়নি—স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেও তিনি যে বিশ্বজয়ী হয়েছেন! বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখের ভাষায়, ‘যে শিরোপা (ক্রেমারকে) অমরত্ব এনে দিয়েছে।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন