প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দুই দশক আগে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, একপ্রকার অসম্ভবকে ছোঁয়ার স্বপ্ন নিয়ে, গত শুক্রবার তা রূপ নিয়েছে একটি মহাকাব্যিক ইতিহাসে। নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল স্পেসএক্স, যা বিশ্ব শেয়ার বাজারে রেকর্ড সৃষ্টিকারী অভিষেকের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। এই অর্জন চরম ব্যর্থতা, চোখ ধাঁধানো সাফল্য আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসা প্রতিষ্ঠানের জন্য যেন এক অমূল্য মুকুট হয়ে উঠেছে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তুলে ধরেছে। সেগুলো হলো:
১. ২০০৮: প্রতিষ্ঠার সাফল্যের গল্প
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠার ছয় বছর পরে এবং একাধিক ব্যর্থতার পর স্পেসএক্স প্রথমবারের মতো মহাকাশের কক্ষপথে রকেট পাঠাতে সক্ষম হয়। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ থেকে রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়।
সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক কয়েক বছর পর সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি প্রথম তিনটি উৎক্ষেপণে ভুল করেছিলাম, প্রথম তিনটি উৎক্ষেপণই ব্যর্থ হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভাগ্য ভালো যে চতুর্থ উৎক্ষেপণটি সফল হয়েছিল। কারণ এরপর আমাদের হাতে আর কোনো টাকা ছিল না। ওইবার সফল না হলে সেখানেই আমাদের গল্প শেষ হয়ে যেত। কিন্তু সেদিন ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল।’
২. ২০১২: পরবর্তী গন্তব্য, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন:
প্রথম সফল উৎক্ষেপণের পর স্পেসএক্স আরও বড় হতে থাকে এবং আরও শক্তিশালী রকেট তৈরি করতে শুরু করে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল তাদের ফ্ল্যাগশিপ রকেট ‘ফ্যালকন ৯’, যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রকেট।
‘ড্রাগন’ মহাকাশযানটি ২০১২ সালে একটি মালবাহী যান হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) ভিড়ে। এটি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রথম এমন অর্জন ছিল। আট বছর পরে, ড্রাগন মহাকাশযানটি মহাকাশচারীদের নিয়ে প্রথমবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাড়ি জমায়। এর মাধ্যমে বোয়িং-এর মতো অন্যান্য শীর্ষ মহাকাশ প্রতিষ্ঠানকে পেছনে ফেলে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান পরিবহনযান হয়ে ওঠে স্পেসএক্স।
৩. ২০১৮: মহাকাশে টেসলা গাড়ি?
এরই ধারাবাহিকতায়, ২০১৫ সালে ফ্যালকন ৯ রকেটের প্রথম অংশটি (ফার্স্ট স্টেজ) সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় স্পেসএক্স। এর মাধ্যমে আংশিক পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট যুগের সূচনা হয়।
এরপর তারা নিয়ে আসে আরও শক্তিশালী রকেট ‘ফ্যালকন হেভি’, যা তৈরিতে দুটি ফ্যালকন ৯ বুস্টার ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে এই রকেটের প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপনের সময় মাস্ক তার আরেক প্রতিষ্ঠান টেসলার তৈরি একটি গাড়ি রকেটে বহনের সিদ্ধান্ত নেন।
সংগীতশিল্পী ডেভিড বোয়ির গান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘স্টারম্যান’ নাম দেওয়া একটি পুতুলকে (ম্যানিকুইন) চালকের আসনে বসিয়ে লাল রঙের টেসলা গাড়ির সেই ছবি পুরো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে স্পেসএক্স-এর সব প্রতিশ্রুতি কিন্তু পূরণ হয়নি। ২০১৮ সালে মাস্ক দাবি করেছিলেন যে তিনি ২০২৩ সালের মধ্যে জাপানি ধনকুবের ইউসাকু মেজাওয়াসহ একদল মানুষকে চাঁদের চারপাশে ঘুরিয়ে আনবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
৪. ২০২০-২০২৩: স্টারবেস-এর বিস্ফোরক সূচনা:
প্রযুক্তির দুনিয়ার বর্তমান এই ট্রিলিওনিয়ার ব্যবসায়ী পরবর্তীতে তার মেগারকেট ‘স্টারশিপ’ তৈরির কাজে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেন। চাঁদে এবং ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে এটির ডিজাইন করা হচ্ছে।
এই প্রজেক্টটি সফল করার জন্য তিনি টেক্সাসে বিশাল জমি কিনে ‘স্টারবেস’ নামে একটি শিল্প কমপ্লেক্স গড়ে তোলেন। সেখানে একের পর এক স্টারশিপের প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক সংস্করণ উৎক্ষেপণ করতে থাকেন। যার বেশিরভাগই বিকট বিস্ফোরণে আগুনের গোলায় পরিণত হয়।
বিস্ফোরণ বোঝাতে ইলন মাস্কের প্রিয় একটি শব্দবন্ধ হলো ‘র্যাপিড আনস্কেডিউলড ডিসঅ্যাসেম্বলি’ বা ‘অনাকাক্সিক্ষত দ্রুত বিচ্ছিন্নকরণ’। তিনি এই বিস্ফোরণগুলোকে যৌক্তিক দাবি করে বলেন, এগুলো আসলে শেখার প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।
৫. ২০২৪: সুপার হেভি বুস্টারকে অভিনব কায়দায় লুফে নেওয়া
২০২৪ সালের অক্টোবরে স্পেসএক্স তাদের স্টারশিপ রকেটের প্রথম অংশ ‘সুপার হেভি’ বুস্টারটিকে এক অভূতপূর্ব ও অনন্য কৌশলে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়, যা আগে কখনো ঘটেনি।
মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণের পর বুস্টারটি আলাদা হয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে এবং স্পেসএক্স-এর লঞ্চ প্যাডেই ফিরে আসে। সেখানে থাকা একজোড়া বিশালাকার যান্ত্রিক হাত বা ‘চপস্টিকস’ দুই দিক থেকে এগিয়ে গিয়ে বুস্টারটিকে শূন্যে লুফে নেয় এবং সেটির গতি থামিয়ে দেয়।
এই ঐতিহাসিক অর্জনটি চমৎকার হলেও, স্টারশিপকে পুরোপুরি পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি ছিল স্পেসএক্স-এর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। বেশ কিছু কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তারা এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন