প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) মিনি ঠিকাদার সাময়িক তালিকাভুক্তি প্রক্রিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিন্ডিকেট এবং আর্থিক লেনদেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দাবি, সরকারি নীতিমালা ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) নির্দেশনা উপেক্ষা করে গোপনে মাত্র ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে প্রাথমিকভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩৩টি প্রতিষ্ঠান কার্যত বঞ্চিত হয়েছে।
জানা গেছে, গত ৬ মে ২০২৫ তারিখে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি স্বল্প দৈর্ঘ্যের বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশন কাজের জন্য মিনি ঠিকাদার প্রাথমিক তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন ফি পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং ১৫ মে পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে যে বিজ্ঞপ্তিতে আরইবির নির্দেশিকা (১০০-৫২)-এ উল্লেখ না থাকা কয়েকটি অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুপারভাইজার ও লাইনম্যানের সনদ বাধ্যতামূলক করা এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুরু থেকেই নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এসব শর্ত আরোপ করা হয়েছিল।
আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে মোট ১৭৬টি আবেদনের মধ্যে ১৭২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেয় রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়। একই সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গ্রহণ করে সাময়িক তালিকাভুক্তির জন্য প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর থেকেই শুরু হয় অনিয়ম। প্রাথমিকভাবে অনুমোদন পাওয়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে কোনো নোটিশ না দিয়ে ঘোরানো হয় দিনের পর দিন অফিসে। অনেক ঠিকাদার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদারদের অভিযোগ, এ সময় পল্লী বিদ্যুতের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পূর্বে তালিকাভুক্ত কিছু ঠিকাদারকে নিয়ে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হিসেবে ডিজিএম (কারিগরি) প্রকৌশলী মো. লুৎফুল হাসান সরকারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে তিনি পুরো তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেন।
তাদের অভিযোগ, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে গোপনে মাত্র ৩১টি প্রতিষ্ঠানের সাময়িক তালিকাভুক্তির প্রস্তাব রংপুরে পাঠানো হয়। বিষয়টি জানার পর রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সব প্রাথমিক অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে আবারও একই ৩১টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে ১০ মে ওই ৩১টি এবং ২১ মে আরও ৮টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও আরাফাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী এনামুল হক বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে টেন্ডারের মাধ্যমে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছি। এবারও নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছি। কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে দূরের জেলার প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যোগ্যতা থাকা সত্বেও রাজনৈতিক তদবির ও সিন্ডিকেটের কারণে অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বঞ্চিত হয়েছে।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ই অ্যান্ড সি) নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, “সেখানে ইঞ্জিনিয়াররাই বিষয়টি দেখাশোনা করেন। আমি সেখান থেকে চলে আসার চার-পাঁচ মাস হয়ে গেছে। বিষয়টি আমার মনে নেই।”
ডিজিএম (কারিগরি) মো. লুৎফুল হাসান সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ঠিকাদার তালিকাভুক্তির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করেন। এখানে আমার কোনো হাত নেই। যাচাই-বাছাই কমিটিতে আমি শুধু একজন সদস্য ছিলাম।”
বর্তমান জেনারেল ম্যানেজার মো. আশরাফুল আলম খান বলেন, “মিনি ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি অতীতের। আগে কীভাবে হয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
অন্যদিকে রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “মোট ১৭৬টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র সঠিক থাকায় প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর সব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সাময়িক তালিকাভুক্তির প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা মাত্র ৩১টি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠায়। আমি দুইবার নির্দেশনা দিয়েছি, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।”
ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের আশঙ্কা, মাত্র ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত রাখলে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার প্রায় ২০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎসেবায় ভোগান্তির মুখে পড়তে পারেন। বিদ্যুৎ সংযোগ, লাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে বিলম্ব, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং গ্রাহক হয়রানির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিবছর নবায়ন ফি থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররা নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রাথমিকভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত সব যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে বিধি অনুযায়ী সাময়িক তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন