প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অধীনে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড থিওলজি–এর জন্য ছয়টি একাডেমিক বিভাগ চালুর প্রস্তাব উঠেছে। শিক্ষকদের মধ্যে এই প্রস্তাব নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। আগামী ২৭ জুন অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম বার্ষিক সিনেট সভায় ইনস্টিটিউটের সংবিধির অনুমোদনের জন্য এটি উপস্থাপন করা হবে।
প্রস্তাবটি পাস হলে নতুন বিভাগগুলো চালুর পথ উন্মুক্ত হবে।
যে বিভাগগুলো প্রস্তাবিত হয়েছে, সেগুলো হলো— আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার, ইসলামিক ল, ফিকহ অ্যান্ড জুরিসপ্রুডেন্স, ইসলামিক ফিলোসফি, এথিকস অ্যান্ড কমপারেটিভ রিলিজিয়ন এবং অ্যারাবিক ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার।
তবে এই প্রস্তাবের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এক পক্ষের মত হলো, বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, খাদ্য ও কৃষির মতো উদীয়মান বিষয়ে নতুন বিভাগ চালু করাই বেশি প্রয়োজন।
অন্য দিকে, যারা এই প্রস্তাবের সমর্থক, তাদের দাবি হলো, এই উদ্যোগটি ইসলামী উচ্চশিক্ষার আধুনিকায়নের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের একটি চাহিদা পূরণ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ জুন একাডেমিক কাউন্সিলের ১৩৯তম সভায় ইনস্টিটিউটের কাঠামো প্রণয়নের জন্য একটি সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরে একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে প্রস্তাবটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এটি সিনেটে পাঠানো হচ্ছে।
ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গবেষণা ফেলো অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত অধিকাংশ বিষয়ই লিবারেল আর্টসের অন্তর্ভুক্ত। তিনি মনে করেন, বিশ্বজুড়ে এসব বিষয়ের চাহিদা কমছে। এ অবস্থায় নতুন বিভাগ চালু করা হলে তা কর্মসংস্থানের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বলেই প্রতীয়মান হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ‘ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার’ ছাড়া বাকি বিষয়গুলো সাধারণত স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে পরিচালিত হয় না। আল-কুরআন ও আল-হাদিসকে একীভূত করে একটি বিভাগ করার প্রস্তাবও তিনি দেন।
আইন ও বিচার অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম বলেন, আইন অনুষদের অধীনে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ‘ল অ্যান্ড পাবলিক পলিসি’ বিভাগ। ইসলামিক ল ও ফিকহ বিষয়ে আলাদা বিভাগের প্রয়োজন নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন এবং জানান, বিদ্যমান আইন পাঠ্যক্রমেই এসব বিষয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পড়ানো হয়, এবং এ বিষয়ে আলাদা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সীমিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, নতুন বিভাগ চালু করতে হলে এআই, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, খাদ্য ও কৃষির মতো বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে ইসলামিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের অধীনে শুধু স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, এতগুলো পৃথক বিভাগ চালুর ফলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়বে এবং বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক ও মানসিক দূরত্ব তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, সুপারিশ কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এম মাহফুজুর রহমান বলেন, দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই এ ধরনের বিভাগ বিদ্যমান। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের ইনস্টিটিউট তৈরির দাবি ছিল।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনা করে আধুনিক ইসলামী উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এসব বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম আব্দুর রব জানান, প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সিনেটে অনুমোদন পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া কোনো ইনস্টিটিউট বা বিভাগ চালু করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং খাদ্য ও কৃষি বিষয়ে নতুন অনুষদ ও বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও একাডেমিক কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, সিনেটে আলোচনা শেষে সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ধর্মীয় বিষয়ে বিদ্যমান ভুল ধারণা ও জ্ঞানের ঘাটতি দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উন্মুক্ত পরিবেশে গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন