প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন নেতাদের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকটি হচ্ছে প্রথমবারের মতো আফগানিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাসীদের কোনো প্রতিনিধিদল ব্রাসেলসে ইইউর সঙ্গে আলোচনায় বসার সুযোগ পেল।
কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তালেবান ধীরে ধীরে ইউরোপের কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছে। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে ইউরোপের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করা। এ ঘটনার ফলে পশ্চিমা কূটনৈতিক কৌশলের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্রাসেলসে তালেবানের উপস্থিতি বিশ্ব কূটনীতিতে একটি নতুন বাঁক সৃষ্টি করছে। বৈঠকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের নাগরিকদের ‘মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন’ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বের সঙ্গে করা হয়। গত ২৩ জুনের বৈঠকটিকে আফগান সরকার 'ঐতিহাসিক' বলে অভিহিত করেছে।
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ একটি আস্থা তৈরির পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইইউতে তালেবানের কূটনৈতিক উপস্থিতিকে কিছুটা ইতিবাচক হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে ইইউর ২৭টি দেশের মধ্যে ১৫ দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত আফগান নাগরিকদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ করতে চেয়েছেন তারা।
২০২১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর পরাজয়ের পর তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে তারা নাগরিক অধিকারের উপর, বিশেষ করে নারীদের শিক্ষার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
ইইউতে তালেবানের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইইউর একটিও দেশ তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাই তালেবান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় রয়েছেন। তবে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি সেই বিচ্ছিন্নতার ভেতরে একটি ফাটল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার পর আফগান নেতারা ইউরোপের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে প্রবেশাধিকার বাড়াতে কাজ করে চলেছেন। যদিও বৈঠকের জন্য তালেবান নেতাদের যে ভিসা দেওয়া হয়েছিল, তার মেয়াদ ছিল মাত্র ২৪ ঘণ্টা। এছাড়া ওই ভিসায় অন্য কোথাও যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা ছিল।
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রিভো জানিয়েছেন, তালেবান প্রতিনিধিদের ভিসা দেওয়ার জন্য বেলজিয়াম ইইউর অনুরোধ মেনে চলেছে। তবে বৈঠকের মাধ্যমে তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না।
ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইইউ দেশগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপের জবাবে বৈঠকটি হয়েছে। কমিশনের মুখপাত্র মার্কাস ল্যামার্ট বলেছেন, আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এর মানে তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়।
বেলজিয়ামের অভিবাসনমন্ত্রী অ্যানলিন ভ্যান বসুইট বৈঠকের আগে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, আমরা আর স্থবিরতা বজায় রাখতে পারি না। একটি শক্তিশালী ও যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এটি সঠিক সময়। যাতে ইউরোপ অভিবাসন ও নিরাপত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে।
তালেবান এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিবিষয়ক গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক ইউরোঅ্যাকটিভ জানিয়েছে, ইউরোপজুড়ে আফগানদের জন্য কনস্যুলার পরিষেবা পুনরায় চালু করার জন্য ইইউ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ব্রাসেলস সফরকে কাজে লাগিয়েছে তালেবান।
তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাহার বলখি ইউরোঅ্যাকটিভকে জানিয়েছেন, ‘ইইউ অঞ্চলে আফগানদের জন্য ব্যাপক পরিসরের কনস্যুলার পরিষেবা পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা বিদেশে বসবাসকারী আফগানদের কনস্যুলার অধিকার সুরক্ষিত করতে একটি ইতিবাচক গতি সঞ্চার করতে চাই।’
অন্যদিকে, ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বলেন, ইউরোপে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া আফগান নাগরিকদের শনাক্তকরণ, ভ্রমণ নথি প্রদান ও তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফরসেল ইউরো নিউজকে বলেন, আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা আফগানরা গুরুতর অপরাধী। সুইডেনে প্রায় ২০০ আফগান নাগরিক নির্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ইউরোপের কোন দেশে কতজন আফগান নাগরিক রয়েছে, সেই বিষয়ে ইউরোপীয় জাতীয় তথ্য অনুসারে দেখা যায়, জার্মানিতে ৪.৩ – ৪.৫ লাখ, অস্ট্রিয়ায় ৮০-৯০ হাজার, ফ্রান্স ও সুইডেনে ৬০-৭০ হাজার, নেদারল্যান্ডসে ৫০-৬০ হাজার, বেলজিয়ামে ২৫-৩০ হাজার, নরওয়েতে ২৫-৩০ হাজার, ডেনমার্কে ২০ হাজারের কাছাকাছি, ফিনল্যান্ডে ১০-১২ হাজার এবং ইতালিতে ২০-৩০ হাজার আফগান নাগরিক অবস্থান করছে।
এছাড়া যুক্তরাজ্যে প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ আফগান নাগরিক রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমের প্রমাণ মিলেছে, এ অবস্থায় ইউরোপীয় সরকার তাদের ফেরত পাঠানোর চিন্তা করছে। তাই তালেবানকে ব্রাসেলসে ডাকার প্রয়োজন ইইউ-এর।
মানবাধিকারকর্মীরা কী বলছেন: রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে ইসলামী জঙ্গিদের বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে নিন্দা করেছে। তবে ইইউ এটিকে ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যাবাসন সহজ করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে সমর্থন করেছে।
এছাড়া ইউরোপের পদক্ষেপে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আফগান অধিকারকর্মী ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই। ওই বৈঠকের পর তিনি লিখেছেন, ইইউ তালেবানের সঙ্গে আলোচনা করছে জেনে তিনি গভীরভাবে হতাশ। সামাজিক মাধ্যমে এক্সের পোস্টে তিনি লেখেন, ইউরোপের উচিত নয় বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের জন্য দায়ী একটি শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া। তালেবানের সঙ্গে যে কোনো সংযোগ আফগান নারী ও মেয়েদের অধিকারকে কেন্দ্র করেই শুরু এবং শেষ হতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক ফেরেশতা আব্বাসি বলেন, তালেবানের সঙ্গে হওয়া যে কোনো আলোচনায় মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নির্বাসিত আফগান নাগরিকদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না।
তিনি বলেন, ইইউ তালেবানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে জবাবদিহিতা দাবি করছে, অন্যদিকে আফগান নাগরিকদের জোর করে তালেবানের হাতে তুলে দিতে চেয়ে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করছে।
ইউএনএইচসিআর-এর নীতি উন্নয়ন ও মূল্যায়ন বিভাগের সাবেক প্রধান ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং ফেলো জেফ ক্রিস্প বলেন, সবচেয়ে স্পষ্ট এবং বিপজ্জনক পরিণতি হলো, আফগানদের ইইউ থেকে ফেরত পাঠানো হলে তারা তালেবানের নিপীড়নের শিকার হবে।
সূত্র: রয়টার্স, এপি ও ইউরো নিউজ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন