প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিষয়টি কিছুটা জটিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সূচকগুলো সামগ্রিকভাবে বেশ সন্তোষজনক হলেও জনগণের মনোভাব খারাপ। কারণ জনগণের পকেটে সরাসরি চাপ পড়ছিল। ট্রাম্প মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্যের জন্য জনগণ সরাসরি ট্রাম্পকে দায়ী করছিলেন। কারণ তাঁর শুরু করা ইরান যুদ্ধের ফলেই জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এই মুদ্রাস্ফীতির চোরাবালিতেই ডুবল রিপাবলিকানদের তরি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা ২০২৪ সালের নভেম্বরে নির্বাচিত হয়েছিলেন অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য। বর্তমানে ২০২৬ সালের নভেম্বর, এবং দুই বছর আগের তুলনায় আমেরিকানরা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আরও বেশি সংকটের মধ্যে রয়েছেন।
২০২১ সালের পর থেকে সবকিছুর দাম যেভাবে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, তা নিয়ে আমেরিকানরা এখনও নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি। জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরে মুদ্রাস্ফীতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি সুযোগ দেওয়ার জন্য ভোটারদের রাজি করাতে তা যথেষ্ট ছিল না। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় নিয়ে সেই ক্ষোভ ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরও অব্যাহতভাবে জমাট বেঁধে রয়েছে।
তবে এই বছরের শুরুতে ট্রাম্প এবং রিপাবলিকানদের কাছে তুলে ধরার মতো একটি চমৎকার অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প ছিল। ২০২৪ সালের পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ মাস পর উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
রিপাবলিকানদের পাস করা ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর অধীনে বড় অঙ্কের ট্যাক্স রিফান্ডের টাকা মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হতে শুরু করেছিল। দীর্ঘ তিন বছরের মধ্যে এই প্রথম বাড়ি কেনার ঋণের সুদের হার ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত শেয়ারগুলোর ওপর ভর করে শেয়ার বাজার ক্রমাগত নতুন নতুন রেকর্ড ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভোক্তা মুদ্রাস্ফীতি চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছিল এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতেও তা সেই সর্বনিম্ন পয়েন্টের কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু এরপরই আমেরিকা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, এবং সবকিছু রাতারাতি বদলে যায়। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ডিজেলের দাম ছুঁয়ে ফেলে নতুন রেকর্ড। আর কোনো নির্বাচনের দিন এর আগে কখনো পেট্রলের দাম এতটা আকাশচুম্বী ছিল না।
ন্যাভি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিদার লং মন্তব্য করেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যদি না হতো, তবে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।’
আমেরিকানরা মুদ্রাস্ফীতিকে সাধারণত অপছন্দ করে। তবে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্যের ওপর তারা বিশেষভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কারণ পেট্রলের দাম শহরের বড় বড় বিলবোর্ডে সব সময় দৃশ্যমান থাকে এবং প্রতি সপ্তাহে গাড়ির ট্যাঙ্কি পূর্ণ করার সময় এটি মনে করিয়ে দেয় যে তাদের পকেট থেকে কত বেশি টাকা খসে যাচ্ছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কেবল চড়া পেট্রল ও ডিজেলের দামের কারণে গড়ে প্রতিটি মার্কিন পরিবারের অতিরিক্ত ১ হাজার ১৫০ ডলার খরচ বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ডের মুনাফা বৃদ্ধি পায় এবং সেই সঙ্গে মর্টগেজ রেটও লাফিয়ে বাড়ে; যা গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ার রেকর্ড।
টানা তিন বছর ধরে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার গতির চেয়ে সাধারণ মানুষের বেতন বাড়ার গতি বেশি ছিল। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে সেই ধারা উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। এরপর থেকেই পুনরুত্থিত মুদ্রাস্ফীতি শ্রমিকদের প্রকৃত আয় গ্রাস করে চলেছে; যার ফলে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে একজন সাধারণ আমেরিকানের প্রকৃত আয় সংকুচিত হয়েছে।
এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অর্থনীতি নিয়ে আমেরিকানদের মধুর স্মৃতি ছিল। ট্রাম্প ১.০-এর প্রতিটি মুহূর্তে আমেরিকানদের কষ্টার্জিত অর্থের কার্যক্ষমতা দাম বাড়ার চেয়ে বেশি ছিল। তাঁর ক্ষমতায় থাকার প্রথম চার বছরে মানুষের বেতন বৃদ্ধির গতি মুদ্রাস্ফীতির গতির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ছিল। এই কারণেই ২০২৪ সালের অক্টোবরে সিএনএন-এর জরিপে ভোটাররা অর্থনীতি সামলানোর ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের চেয়ে ট্রাম্পকে ১৫ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রেখেছিলেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই- রেস থেকে সরে দাঁড়ানোর আগে নেওয়া শেষ সিএনএন জরিপে অর্থনীতির ওপর বাইডেনের নেট সমর্থন ছিল মাইনাস ৩১ পয়েন্ট। ট্রাম্পের রেটিং এখন বাইডেনের চেয়েও খারাপ, এবং তা একটি বড় ব্যবধানে: অক্টোবর মাসের সিএনএন জরিপ অনুযায়ী, অর্থনীতিতে তাঁর নেট সমর্থন মাইনাস ৪৬ পয়েন্ট।
ট্রাম্প ২.০-এর গল্পটি ট্রাম্প ১.০ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক আমেরিকানের কাছে মনে হচ্ছে খরচ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং ‘আমেরিকান ড্রিম’ অধরা হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এবং কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য ডেমোক্র্যাটদের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্পের কিছু নীতি—বিশেষ করে তাঁর অজনপ্রিয় যুদ্ধ—নিশ্চিতভাবেই আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিষয়টি কেবল পেট্রোলের দামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, যা মানুষের মাসিক খরচে প্রায় ৭৫ ডলার যোগ করেছে। এটি অন্যান্য খরচগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যা ভোটাররা ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সঙ্গে যুক্ত করেন; যার মধ্যে কিছু খরচ তাদের বিলে প্রতি মাসে শত শত ডলার অতিরিক্ত যুক্ত করছে। ২০২৫ সালে অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের বর্ধিত ভর্তুকি বাড়াতে রিপাবলিকানদের ব্যর্থতার কারণে এই বছর ওবামাকেয়ার-এর মাসিক প্রিমিয়াম গড়ে ৫৮ ভাগ বেড়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিদ্যুতের খরচ ৮.৭ ভাগ বেড়েছে। ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি এবং শুল্কের কারণে গাড়ি মেরামতের খরচ ট্রাম্পের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১২.৩ ভাগ লাফিয়ে উঠেছে। বাড়ি নির্মাণের খরচ বেড়েছে ১৩.৩ ভাগ। ট্যাক্স ফাউন্ডেশন-এর মতে, ট্রাম্পের শুল্কের কারণে এই বছর গড়ে প্রতিটি মার্কিন পরিবারের ট্যাক্স বাবদ ৮২০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ স্টিভেন ডুরলাফ বলেন, ‘তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় বাইডেন সবকিছু পুরোপুরি বরবাদ করে দিয়েছিলেন; তবু তা কোনোভাবেই ট্রাম্পকে নির্দোষ প্রমাণ করে না। ট্রাম্প মুদ্রাস্ফীতি খুব বাজেভাবে সামলেছেন। ভোটারদের অবশ্যই প্রশাসনের নীতিগুলোর ওপরই এর দায় চাপাতে হবে।’
সমস্ত প্রমাণ ইঙ্গিত করে যে ভোটাররা ঠিক সেটাই করেছেন। আর এটাই একটি বড় কারণ যার জন্য মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে চরম পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। সূত্র: সিএনএন
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন