প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের গণ্ডিকে বলা হয় জীবনের প্রাণকেন্দ্র। এর গতিবিধিই নির্ধারণ করে দেয় একজন শিক্ষার্থী কিভাবে তার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে, কিভাবে আঁকবে তার ভবিষ্যতের রূপরেখা।
কিন্তু সেই চিত্রপটে সহসাই ধূসর আঁচড় ফেলতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনঃ ভর্তি। কারো জন্য এই ব্যাঘাত সাময়িক হলেও কিছু ক্ষেত্রে হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘ মেয়াদের দুঃস্বপ্ন। যা পথভ্রষ্ট করতে পারে শিক্ষার্থীদের।
ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত, এই পুনঃ ভর্তির খপ্পরে পড়ছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিভাগে সর্বশেষ চার শিক্ষাবর্ষে মোট ২৭৮ জন শিক্ষার্থী পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে পুনঃ ভর্তি হয়েছেন। যা গড়ে প্রতি শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৭০ জন এবং শতকরা হিসেবে এটি দাঁড়িয়েছে প্রায় সাতজনে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহায়ক ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে পুনঃ ভর্তির হার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের একাডেমিক শাখা থেকে জানা যায়, সর্বশেষ চার শিক্ষাবর্ষের মধ্যে ২০২২-২৪ শিক্ষাবর্ষের সর্বোচ্চ মোট ৯২ জন।
সবচেয়ে কম হয়ে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ৪৭ জন। এছাড়া ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ৫১ জন এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ৮৯ জন।
এখানে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই চার শিক্ষাবর্ষের হিসেবে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে পুনঃ ভর্তি ছিল ৫১ জন। ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ জনে। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় এখানে প্রায় ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ পুনঃ ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আবার ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের পুনঃ ভর্তির সংখ্যাটা কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪৭ জন। অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৪৮.৯১% হ্রাস পেয়েছে। যা কিছুটা স্বস্তির হলেও পুনরায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯ জনে। ফলে এখানে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় প্রায় ৮৯.৩৬% বৃদ্ধি ঘটেছে।
আরো জানা যায়, এরমধ্যে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে সর্বোচ্চ ১৭ জন। যেখানে লোক প্রশাসন বিভাগে পাঁচজন, প্রত্নতত্ত্বে ৫ পাঁচজন, অর্থনীতিতে চারজন, নৃবিজ্ঞানে দুইজন এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে একজন। পরবর্তীতে বিজ্ঞান অনুষদের ১৪ জনের মধ্যে গণিত বিভাগে চারজন, রসায়নে চারজন, পদার্থবিজ্ঞানে তিনজন, ফার্মেসীতে দুইজন এবং পরিসংখ্যানে একজন।
এ ছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ১৩ জনের মধ্যে ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগে ছয়জন, একাউন্টিংয়ে এবং মার্কেটিংয়ে তিনজন করে, ফিনান্সে একজন। এ ছাড়া আইন অনুষদভুক্ত আইন বিভাগে একজন, প্রকৌশল অনুষদভুক্ত আইসিটি বিভাগে পাঁচজন এবং কলা ও মানবিক অনুষদভুক্ত ইংরেজি বিভাগে একজন পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে পুনঃ ভর্তি হয়েছেন।
পরবর্তী ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মোট ৯২ জনের মধ্যে শুধু বিজ্ঞান অনুষদেরই ৩৬ জন পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে পুনঃ ভর্তি নিয়েছেন। এর মধ্যে গণিতে ১৩ জন, রসায়ন এবং পরিসংখ্যানে সাতজন, পদার্থবিজ্ঞানে ছয়জন এবং ফার্মেসীতে তিনজন করে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ২২ জনের মধ্যে লোক প্রশাসন বিভাগে সাতজন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ছয়জন, অর্থনীতিতে পাঁচজন, প্রত্নতত্ত্বে তিনজন এবং নৃবিজ্ঞানে একজন।
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ১৮ জনের মধ্যে মার্কেটিংয়ে সাতজন, একাউন্টিং এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগে চারজন করে এবং ফিনান্সে তিনজন। এছাড়া কলা ও মানবিক অনুষদের সাত জনের মধ্যে বাংলায় চারজন এবং ইংরেজিতে তিনজন করে, প্রকৌশল অনুষদভুক্ত আইসিটিতে পাঁচজন এবং আইন অনুষদভুক্ত আইন বিভাগে চারজন।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মোট ৪৭ জনের মধ্যে বিজ্ঞান অনুষদের পদার্থবিজ্ঞানে সাতজন, গণিতে ছয়জন, রসায়নে তিনজন এবং পরিসংখ্যানে একজন নিয়ে মোট ১৭ জন। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ১২ জনের মধ্যে অর্থনীতি এবং প্রত্নতত্ত্বে পাঁচজন করে এবং লোক প্রশাসন এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় একজন করে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সাতজনের মধ্যে একাউন্টিং এবং মার্কেটিংয়ে দুইজন করে ব্যবস্থাপনা শিক্ষায় তিনজন।
এ ছাড়া কলা ও মানবিক অনুষদের পাঁচজনের মধ্যে বাংলায় তিনজন এবং ইংরেজিতে দুজন। প্রকৌশল অনুষদের চারজনের মধ্যে সিএসইতে তিনজন এবং আইসিটিতে একজন এবং আইন অনুষদভুক্ত আইন বিভাগে একজন পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে পুনঃ ভর্তি নিয়েছেন।
সর্বশেষ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের মোট ৮৯ জনের মধ্যে বিজ্ঞান অনুষদের গণিত বিভাগে ১০ জন, পদার্থবিজ্ঞান ও ফার্মেসীতে নয়জন করে এবং পরিসংখ্যান ও রসায়নে ৪ জন করে মোট ৩৬ জন। এছাড়া সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ২৪ জনের মধ্যে প্রত্নতত্ত্বে নয়জন, লোক প্রশাসন, নৃবিজ্ঞান ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় চারজন করে এবং অর্থনীতিতে তিনজন।
এছাড়াও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ৯ জনের মধ্যে মার্কেটিংয়ে ৪ জন, ব্যবস্থাপনায় ৩ জন এবং ফিনান্সে ২ জন এবং কলা ও মানবিক অনুষদের ৮ জনের মধ্যে বাংলায় ৫ জন, ইংরেজিতে ৩ জন, আইন অনুষদভুক্ত আইন বিভাগে ৮ জন, প্রকৌশল অনুষদের ৪জনের মধ্যে আইসিটিতে ৩ জন, সিএসইতে ১ জন।
এখানে ৪ শিক্ষাবর্ষের তথ্য বিশ্লেষণে আরো পাওয়া যায়, অনুষদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুনঃ ভর্তির ঘটনা ১০৩টি ঘটেছে বিজ্ঞান অনুষদে বিজ্ঞান অনুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৫ টি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। পরবর্তী সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ৭৫ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২ জন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ৪৭ জনের মধ্যে মার্কেটিং এবং ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগে সর্বোচ্চ ১৬ জন করে। প্রকৌশল অনুষদের ১৮ জনের মধ্যে আইসিটি বিভাগে সর্বোচ্চ ১৪ জন এবং আইন অনুষদের একমাত্র বিভাগ আইনে ১৪ জন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুনঃ ভর্তির যাত্রা শুরু হয় সেকেন্ড টাইম প্রস্তুতি দিয়ে। প্রথম বর্ষে পুনঃ ভর্তি প্রবণতার সবচেয়ে বড় একটি কারণ এটি। ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়াচ্ছে প্রথম বর্ষের পরিস্থিতি। অনেকেই ভালো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ভালো বিষয়ের আশায় শুরুতে একাডেমিকের বাহিরের পড়াশোনায় মনোযোগী থাকে, ফলে পরবর্তীতে পুনঃ ভর্তি ছাড়া দ্বিতীয় কোন সুযোগ থাকে না।
বিজ্ঞান অনুষদের বেশি পুনঃ ভর্তির কারণ সম্পর্কে জানা যায়, কঠিন ও সময়সাপেক্ষ সিলেবাস, ল্যাবভিত্তিক ক্লাস ও পরীক্ষার চাপ, কোর্স পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার হার বেশি, পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির প্রস্তুতির দ্বৈত চাপ, দীর্ঘ সময় পড়াশোনা, পরীক্ষা ও প্রজেক্টের চাপে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে ইত্যাদি।
এছাড়া সার্বিকভাবে আরো কারণের মধ্যে রয়েছে, বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বহিষ্কার, আর্থিক অসচ্ছলতা, মানসিক অবসান, হতাশা, অসুস্থতা, ইংরেজি ভার্সনে পড়াশোনা, এক বিভাগে পড়াশোনা করে থেকে অন্য বিভাগের সাবজেক্টে ভর্তি হওয়ায় তৈরিকৃত চাপ। এছাড়া রয়েছে অ্যাকাডেমিক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারা এবং ভাষাগত সমস্যা ইত্যাদি।
এই সমস্যাটির সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। এবং পুনঃ ভর্তি পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা সামলানোর জন্য প্রয়োজন হয় মানসিক উন্নতির গাইডলাইন। যা তাদেরকে সাহায্য করতে পারে হতাশা কমানোতে। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থানে। এখানে শিক্ষার্থীদের মানসিক দেখভালের জন্য নেই কোন ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে শেষ কবে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে সভা-সেমিনার কিংবা কাউন্সেলিং ক্যাম্পেইন হয়েছে বলা দুষ্কর। ফলে এ বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের পাওয়ার কিছুই নেই।
নাম এবং শিক্ষাবর্ষ প্রকাশ না করার শর্তে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই রিএড আমার জন্য এখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে। হুট করে জুনিয়রদের সাথে ক্লাস করতেও শুরুতে খুব অস্বস্তি লাগতো। সেকেন্ড টাইম প্রিপারেশনের জন্য এখানে ক্লাস-পরীক্ষা কিছুই করি নাই। এখন বুঝতে পারছি, তখন ভুল করেছিলাম। তখন অন্তত ক্লাসগুলো করা থাকলে ইয়ার লস খেতাম না।’
পুনঃ ভর্তি হওয়া গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা নতুন অনেককিছুই বুঝতে পারে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যদি তাদের সঠিক গাইডলাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমরা এ বিষয়টি পরিকল্পনায় রেখেছি। আমরা নতুন বর্ষের শিক্ষার্থীদের সাথে ধাপে ধাপে কাজ করা পরিকল্পনা করেছি। শুরুতে তাদেরকে একটি ফর্মে প্রশ্নের মাধ্যমে তাদের মানসিক অবস্থা গুলো জানার চেষ্টা করব। তারপর ধাপে ধাপে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী গাইডলাইন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এতে করে প্রথম বর্ষে তাদের সমস্যাগুলো সমাধানে সহায়ক হবে। আমরা পরিকল্পনা করেছি, সামনে সেগুলো বাস্তবায়ন করব ইনশাল্লাহ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন