প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মিয়ানমারের সামরিক নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর প্রথমবারের মতো সরকারি সফরে থাইল্যান্ডে পৌঁছেছেন। এই সফরটি তার দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিন অং হ্লাইং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এর পর মিয়ানমারে ব্যাপক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে তার ভূমিকার কারণে মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছিল। পশ্চিমা দেশগুলো তাকে কার্যত কূটনৈতিকভাবে একঘরে করে রেখেছে এবং তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেনাপ্রধানের পদ ছেড়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশই ওই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি এবং দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায়, যা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে ভোটগ্রহণ হয়নি। এইভাবে সেনাবাহিনী সমর্থিত দলটি নতুন পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছে।
২০১৭ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সঙ্গে স্বাক্ষরিত পাঁচ দফা ঐকমত্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মিন অং হ্লাইংকে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ঐকমত্য অনুসারে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সহিংসতা কমানো এবং বিরোধী পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে বলা হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি আসিয়ান সদস্য দেশ মনে করে, মিয়ানমারের মানবিক সংকট নিরসন ও গৃহযুদ্ধ বন্ধে সেনাবাহিনীকে আরও ছাড় দিতে হবে, এরপরই পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার সম্ভব।
থাইল্যান্ড ভিন্ন নীতি অবলম্বন করছে। দেশটি এই অবস্থানকে ‘পরিমিত পুনঃসম্পৃক্ততা’ বলে অভিহিত করছে। ব্যাংককের যুক্তি হলো, মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের প্রায় দুই হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন, মানবপাচার ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলি মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সরকারি যোগাযোগ প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডে মিন অং হ্লাইংকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। সফরসূচিতে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, থাই পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক এবং থাই-মিয়ানমার ব্যবসায়িক ফোরামে অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ফোরামের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার করা।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আয়োজন কার্যত মিয়ানমারের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক’-এর একটি প্রতিচ্ছবি। থাইল্যান্ডের এই পদক্ষেপটি মিয়ানমারের দুটি বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ চীন ও ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। নির্বাচনের পর উভয় দেশই নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং মিন অং হ্লাইংকে সরকারি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
বিশেষ করে চীনের সমর্থন মিয়ানমারের সামরিক সরকারের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের সহায়তা সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করতে এবং বিদ্রোহীদের দখলে থাকা কিছু এলাকা পুনর্দখলে সহায়তা করেছে।
অথচ থাইল্যান্ডের এই উচ্চপর্যায়ের আতিথেয়তা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও আসিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই থাইল্যান্ডের এই পদক্ষেপকে সামরিক সরকারের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে দেখছেন। অধিকারভিত্তিক সংগঠন জাস্টিস ফর মিয়ানমার এক বিবৃতিতে বলেছে, “থাই সরকার চলমান কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সামরিক জান্তাকে ভুয়া বৈধতা দিচ্ছে।”
সংগঠনটি আরও বলেছে, “মিন অং হ্লাইংয়ের এই সফর থাইল্যান্ডের তথাকথিত ‘পরিমিত পুনঃসম্পৃক্ততা’ নীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন, যা মিয়ানমারের জনগণের চলমান দুর্ভোগকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।”
বিশ্লেষকদের মতে, থাইল্যান্ডের এই সফর শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দিক দিয়েই নয়, আসিয়ানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, মিয়ানমার নীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন