প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাহুলের শেষ ছবির জন্য আমি এখনও প্রস্তুত নই, আমি এখনও মেনে নিতে পারি নাই যে সে চলে গেছে। রাহুলের মৃত্যু সংবাদ যখন তার মা এবং সন্তানকে জানানো হয়েছিল, তখন থেকেই আমি স্তব্ধ হয়ে আছি: প্রিয়াঙ্কা।
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর গত প্রায় দেড় মাস কেটে গিয়েছে। এনিয়ে তার ছেলে সহজের সঙ্গে বেঁচে আছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। কাজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন অভিনেত্রী। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তার নতুন ওয়েব সিরিজ ‘তারকাটা’। ছবির প্রচারে সাদা শাড়িতে হাজির হয়েছেন তিনি। হাতে এক কাপ কফি নিয়ে শুরু হলো আড্ডা। কাজ, পরিবার, জীবন — সব নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রতিনিধি সঙ্গে বসে মন খুললেন প্রিয়াঙ্কা।
প্রশ্ন: সহজকে নিয়ে গরমের ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল, গিয়েছিলেন?
প্রিয়াঙ্কা সরকার: না, যাওয়া হয়নি। কাজের চাপ ছিল। এই মুহূর্তে কলকাতা শহর ছাড়াও অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে ওই প্রতিশ্রুতির ট্রিপটা এখনো বাকি। সহজ খুবই সচেতন, ও এই পরিস্থিতি বেশ ভালোভাবে সামলে নিয়েছে। সহজ আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।
প্রশ্ন: আপনি এবং সহজ এখন কেমন আছেন?
প্রিয়াঙ্কা: আমি ঠিক আছি। নিজেকে কাজের মধ্যে রেখেছি। আশেপাশে দারুণ কিছু মানুষ রয়েছে। আর আমার সহজও নিজের মতো করে গরমের ছুটি কাটাচ্ছে। ও গান নিয়ে ব্যস্ত, কম্পিউটার, গেমস — এসব নিয়ে সময় কাটাচ্ছে। বন্ধুরাও রয়েছে তার সঙ্গে। যতটা সম্ভব আমি সময় দিচ্ছি। বাড়ির সদস্যরাও সময় করে দেখছে ওর সঙ্গে। রাহুলের মায়ের কথাও জানানো দরকার, তিনি খুব ভাল আছেন, এমনটা আমি বলার অধিকারও রাখি না। আমরা নিজেদের মতো চেষ্টা করছি কঠিন সত্যটা মেনে নিতে। সময়ের সঙ্গে সব সহজ হয় না। আসলে নিজেকে বোঝাতে হয়, সেটাই করছি।
ছেলে সহজের সঙ্গে ছুটির মেজাজে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা ছবিটি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: রাহুলের পরিবারকেও আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন?
প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ, যতটা সম্ভব সময় কাটানোর চেষ্টা করছি। সহজও পাশে থাকে। দাদা বেশ কিছু দিন ছিল। মা তাঁর সঙ্গে বিদেশে থাকবেন। দাদার দুই ছেলেমেয়ের সঙ্গেও দেখা হবে। এখন আমরা বেশিরভাগ সময় রাহুলকে ব্যস্ত রেখেছি। কিছু কিছু সময় আসবে যখন কলকাতা শহরটা সহ্য করার মতো থাকবে না, সেই সময়ে বাইরে থাকলে ভালো থাকবে। আবার আমি চাইব, সহজ তার বিশেষ দিনগুলোতে ঠাম্মিকে পাশে পায়। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: সকলকে সামলে নিজেদের কাছে ফেরার পর কি প্রিয়াঙ্কা ভেঙে পড়েন?
প্রিয়াঙ্কা: আসলে আমি অনেকটা সময় চুপ ছিলাম। কিন্তু আসলে আমি ভেঙে পড়েছি। যখন রাহুলের মৃত্যু সংবাদটি তার মাকে জানানো হলো, আর তার কিছুসময় পরে ছেলেকে জানানো হলো, তার পর মনে হয়... না, মানে ঠিক আনার ভাষায় বোঝাতে পারব না। আসলে এর কোনও ক্লোজার হয় না। আমাকে শক্ত থাকতে হয়েছে। এটাই আমার বড় হয়ে ওঠার একটি পজিটিভ থাকার ট্রেনিং। আর তার মূল অংশ ছিল রাহুল । ও আমার জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিল।
প্রশ্ন: ছবির চরিত্র বাছার ক্ষেত্রেও তো রাহুল আপনাকে সাহায্য করতেন?
প্রিয়াঙ্কা: রাহুল সব ক্ষেত্রেই আমাকে সহযোগিতা করেছে। এখনও ওর দেওয়া কিছু সিরিজ আর ছবি আমার ফোনে আছে, যেগুলো আমি দেখিনি। এখনও দেখতে পারিনি আমি। আসলে ঘটনার আকস্মিকতায় আমি এখনও কিছুটা মেনে নিতে পারিনি। ধীরে ধীরে মেনে নিতে হবে।
‘রাহুলের শেষ অভিনীত ছবি দেখতে এখনও প্রস্তুত নই’ ছবিটি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: রাহুল অরুণোদয়ের শেষ ছবি ‘ছবিওয়ালা’ আপনি দেখেছেন?
প্রিয়াঙ্কা: আমি দেখব নিশ্চয়ই, তবে এখনও প্রস্তুত নই, একটু সময় লাগবে দেখতে। এখানে আরও কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো আটকে রয়েছে। আমি চাই, রাহুলের অসমাপ্ত কাজগুলো দর্শকদের সামনে আসুক। রাহুল দারুণ অভিনেতা ছিলেন, তাঁর প্রতি সেই শ্রদ্ধাটা যেন বজায় থাকে।
প্রশ্ন: রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে?
প্রিয়াঙ্কা: এই মুহূর্তে আপডেট দেওয়ার মতো খবর আমার কাছে নেই। যেগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়ে কিছু বলতে পারব না। কারণ এর একটা আইনি দিক রয়েছে। তবে আমরা আশাবাদী। এই ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন অপশন নেই। শুরুর দিন থেকে আমি প্রত্যেককে পাশে পেয়েছি। এটা শুধুমাত্র আমাদের পরিবারের দাবি নয়। ইন্ডাস্ট্রির সকলেই উত্তর চান কিভাবে এই ঘটনা ঘটল।
‘তারকাটা’ ছবির প্রচারে বিক্রম চট্টোপাধ্যায় ও প্রিয়াঙ্কা সরকার ছবিটি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: ‘তারকাটা’ ছবির চরিত্রটি কতটা উপভোগ করেছেন?
প্রিয়াঙ্কা: যে সময়টার শেষ মুহূর্তের কাজে ফিরেছি, আমার বন্ধুদের না থাকলে এটি সম্ভব হত না। 'তারকাটা' একটি মজার কাজ। ডার্ক হিউমার রয়েছে, যা আমি খুবই ভালবাসি। এত রিয়েল অ্যাকশন আগে দেখা যায়নি কোনও বাংলা ওটিটিতে। সব মিলিয়ে খুবই অন্যরকম একটি কাজ দর্শকদের আনন্দ দেবে।
প্রশ্ন: আপনি নাকি বলেছিলেন, ‘তারকাটা’ নামের একটি ছবি হলে আমি নেই, হতেই পারে না?
প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম। বলেছিলাম যে এই প্রজেক্টে আমার থাকার ভাগ্যে লেখা আছে। কে সতেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে চলে আসে একটি সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে? কারণ, আমার কাছে আমি খুব স্বচ্ছ। আমি যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি সেটা সঠিক মনে হতে পারে, আবার ভুলও মনে হতে পারে। আমি তারকাটা থাকতে চাই। পৃথিবী যাই বলুক, আমি আমার সিদ্ধান্তকেই গুরুত্ব দিই। কারণ, আমাকে বিভিন্ন সময়ে নানা মানুষ তারকাটা বলেছেন। আমি তা প্রশংসা হিসেবেই নিয়েছি। এবং সহজও তারকাটা হোক, সেটাই আমি চাই। ও সাহস রাখুক, যা করতে চায় করুক এবং নিজের কাছে সৎ থাকুক।
প্রশ্ন: নিজের সিদ্ধান্ত নিলে আক্ষেপ কম হয়?
প্রিয়াঙ্কা: হ্যাঁ, অবশ্যই। জীবনের যে কোনও সিদ্ধান্তের দায় আমার। ভুল সিদ্ধান্তেরও দায় আমার। কাউকে দোষ দেওয়ার নেই। কোনও আক্ষেপ নেই। যা কিছু হয়েছে তা জীবনে ভাল ছিল। কখনও কখনও জীবনের সেরা সময় এসেছে, কখনও আবার শিক্ষা পেয়েছি। জীবনের প্রতি এই পন্থা রাখা জরুরি।
প্রশ্ন: প্রযোজক এবং অভিনেতা বিক্রমের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?
প্রিয়াঙ্কা: আমি বহু বছর ধরে বিক্রমকে চিনি, ওঁর কাজ দেখি। যে ভাবে এঁর সফর এগিয়ে চলছে তা দারুণ। প্রযোজক হিসাবে নতুন কিছু করার ঝুঁকি নিয়েছে, সেটি প্রশংসার দাবি রাখে। যে ভাবে অভিনেতা হিসাবে কাজ বাছাই করে সেটাও শেখার জন্য। এমনিতে বিক্রম খুব পরিশ্রমী এবং যত্ন সহকারে কাজ করে। সহ-অভিনেতা হিসেবে এই ধরনের দেখলে সত্যিই নিজের কাজের উন্নতি হয়।
‘যাঁরা পাশে ছিলেন তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ’ ছবিটি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: টলিউডেও পরিবর্তন এসেছে, কীভাবে দেখছেন?
প্রিয়াঙ্কা: অনেক কিছুই দর্শকের সামনে রয়েছে। যদি ইন্ডাস্ট্রিকে একটি পরিবার বলি, তবে এটা মনে রাখা উচিত, কোন পরিবারই নির্লেজ্জ থাকে? সমস্যা তো আসতেই পারে। এক লক্ষ মানুষ একসঙ্গে কাজ করা মানে সমস্যা থাকবেই। সেগুলো অনেক বেশি দর্শকের সামনে চলে এসেছে। এটা কোথাও গিয়ে শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা কমায়। আমি শুধু এটুকুই বলবো যে, শুরুর দিন থেকে সকলকে যে ভাবে পাশে পেয়েছি, তাতে কোনও রাজনৈতিক রং ছিল না। অগ্রজ, অনুজ এবং পরিচালক, অভিনেতার মধ্যে কোনও ভেদাভেদ ছিল না। সবাই একসঙ্গে রাহুলকে লেখক, বন্ধু এবং ছোট ভাই হিসাবে ভালোবেসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁরা একই সুরে কথা বলেছেন, রং বা বর্ণের ভেদাভেদ ছিল না। যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন: নতুন সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
প্রিয়াঙ্কা: আমি অত্যন্ত আশাবাদী। সকলের মতোই বিশ্বাস করি, ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো কাজ হবে। আমি চাই, আরও সংখ্যায় কাজ হোক। যেন আমরা সবাই কাজ করার সুযোগ পাই।
প্রশ্ন: ‘সহজ কথা’-র ভবিষ্যৎ কী?
প্রিয়াঙ্কা: এটি আসলে খুব কঠিন বিষয়। অনেকেই সহজকে এবং আমাকে চালিয়ে নিয়ে যেতে বলছেন। সহজের উপর এধরনের চাপ দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, সে তো মাত্র ১২ বছরের একটি শিশু। আমি মনে করি, রাহুলের এত বছরের গড়ে তোলা, ওর কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, শিক্ষা, পড়াশোনা এসবের জন্যই এটি সম্ভব হয়েছে। রাহুল মানুষকে বিশেষ অনুভব করতে সক্ষম ছিল। আমি তা পারব না। আমি চাই, এটি চলুক। কিন্তু কিভাবে, সেটি এখনো ভাবতে পারিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন