প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা ও পেশাজীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও, এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে স্বাধীন চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং মৌলিক সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নে, বিশ্বের নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নতুন নীতিমালা গ্রহণ করছে। এই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষস্থানের আইন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসরুমে ল্যাপটপ, স্মার্টফোনসহ সকল ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নতুন নয়। তবে এবার ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো-এর ল স্কুল। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবেন না, যার মধ্যে ল্যাপটপ এবং স্মার্টফোনও অন্তর্ভুক্ত।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের তথ্য অনুযায়ী, এআই যুগে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী সক্ষমতা এবং মৌলিক আইনি দক্ষতা বিকাশের লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে একজন দক্ষ আইনজীবীর জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলী গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই নীতির সূচনা করা হয়েছে।
ল স্কুলের মূখ্য বক্তব্য ছিল, 'শিক্ষার্থীরা যেন এআইয়ের ওপর নির্ভরতা না রেখে, স্বকীয়তা, কৌশলগত চিন্তা এবং গভীরভাবে স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখে, তা নিশ্চিত করতেই আমাদের এই পদক্ষেপ।'
শুধু ক্লাসরুমেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়টি পরীক্ষা ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষা ক্লাসরুমের ভেতরেই অনুষ্ঠিত হবে এবং পরীক্ষার সময় ইন্টারনেট, কোনো ইলেকট্রনিক ফাইল অথবা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই নীতিমালা ভবিষ্যতে পুনর্মূল্যায়ন, পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা হতে পারে। তাদের ভাষায়, 'প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তনশীল। ফলে বর্তমান নিয়মগুলো প্রযুক্তি ও আইনি পেশার বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে পরিবর্তন করা হতে পারে।'
অথচ বিশ্ববিদ্যালয় এটিও স্বীকার করেছে যে, আইন পেশার ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাই ক্লাসে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত করলেও, পাঠ্যক্রমের নির্দিষ্ট অংশে শিক্ষার্থীদের এআই প্রযুক্তি শেখানো হবে। এতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে পেশাগত জীবনে এই প্রযুক্তি দায়িত্বশীল, কার্যকর এবং নৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারবেন।
আইন পেশা বর্তমানে এআইয়ের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ও অটোমেশনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা পেশাগুলোর মধ্যে আইন অন্যতম। 'এআই এক্সপোজার ইনডেক্স'-এর সেই গবেষণায় আইন পেশাকে শতভাগ 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, আইন পেশার অনেক জ্ঞানভিত্তিক এবং বিশ্লেষণধর্মী কাজ বর্তমানে এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব।
ইতোমধ্যেই আদালতের মামলায় প্রস্তুতিতে এআই আইনজীবী ব্যবহৃত হচ্ছে। গত মাসে যুক্তরাজ্যের একটি এআইভিত্তিক ল ফার্ম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি সফল মামলার প্রস্তুতিতে এআই আইনজীবী ব্যবহার করে নতুন নজির স্থাপন করেছে। 'গারফিল্ড এআই' নামক প্রতিষ্ঠানটি সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি সংগ্রহ এবং ট্রায়ালের প্রস্তুতির কাজে তাদের এআই আইনজীবীকে ব্যবহার করে। পরে একজন মানব ব্যারিস্টার আদালতে মামলাটি পরিচালনা করেন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ ইয়ং লিংকডইনে লিখেছেন, 'মানুষের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একজন এআই আইনজীবীর জয়ে এটি বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ট্রায়াল। এটি সবার জন্য আইনি সহায়তা আরও সহজলভ্য করার পথে নতুন যুগের সূচনা করেছে।'
ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা এবং আইনি পেশার বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য। একদিকে এআই কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে স্বাধীন চিন্তা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং মৌলিক দক্ষতা ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে আসছে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো ল স্কুলের এই পদক্ষেপ সেই ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা যেতে পারে। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি মানবিক বিচারবোধ ও সৃজনশীল চিন্তাশক্তি বিকাশই যে ভবিষ্যতের এক বড় চ্যালেঞ্জ, এই উদ্যোগ সেটিরই প্রতীক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন