প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সারা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ইসলাম ধর্মের অনুসারী মানুষদের প্রথম কিবলা থেকে শুরু করে পরবর্তী কিবলা - মক্কা মদিনা সহ নবী-রাসূলদের, সাহাবীদের আগমন প্রস্থান এর জন্য পবিত্র ও পূণ্যভূমি হিসেবে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যে সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। কিন্তু ইসলামের নীতি আদর্শ, মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র ক্ষমতা এবং বিলাসিতার জন্য আরব রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন থেকেই ইসলামের সুমহান ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে গিয়ে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামের সুমহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। সেই সাথে তারা ভুলে গিয়েছে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী ধর্ম এবং জাতি হিসেবে তারা একসময় গোটা পৃথিবী শাসন করত। যাতে মানুষ শান্তিতে, নিরাপত্তায় এবং স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন করে বেঁচে থাকতে পারতো। কিন্তু ক্ষমতা, অর্থ ও বিলাসিতার মোহে গা ভাসিয়ে দিয়ে তারা বিধর্মী ইহুদি, খ্রীষ্টান , নাছারাদের কে বন্ধু মেনে নিজেদেরকে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকেও ধ্বংসের জন্য ইহুদিবাদী মুসলিম বিদ্বেষী শক্তি গুলোকে তাদের রাষ্ট্র ব্যবহার করে সহযোগিতা এবং বন্ধুত্ব তৈরি করার এমন মুসলিম বিদ্বেষী অবস্থান বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মুসলমানদের জন্য কখনোই কাম্য ছিল না। ফিলিস্তিন বিশ্বের একমাত্র এমন একটি বিশ্বাসী মুসলিম রাষ্ট্র যাদের উপর যুগের পর যুগ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনা বর্বরতম ও ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা চালাতে নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে। অথচ এসব করার জন্য আরব বিশ্বের এই মুসলিম নামক রাষ্ট্রগুলোই তাদের দায়িত্ব ভুলে গিয়েছে। যেখানে তাদের ভাইকে হত্যা করা হয় সেখানে তারা শত্রুদেরকে নিজেদের দেশে জায়গা থেকে শুরু করে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করে আসছিল এবং এখনো সে কাজই করছে। এখান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কখনোই তারা ইসলামের ঐতিহ্যবাহী এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সঠিক প্রতিনিধি বলে বিশ্বের মুসলমানদের কাছে দাবী করতে পারবে না। সুতরাং সময় এসেছে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে ইসলামের সুমহান আদর্শকে ধারণ করে ইসলামের ঐতিহ্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং মুসলিম বিশ্বের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ঠিক পূর্বের মতোই তৈরি করা যখন একটি রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র বা অঞ্চল তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—এই অঞ্চলের নিরাপত্তা আর কেবল বাইরের শক্তির কৌশলের ওপর নির্ভর করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনা, ইয়েমেন সংকট, গাজায় দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয় এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস মিলিয়ে গোটা অঞ্চল এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পুরোনো নীতির পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিভাজন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বহিঃশক্তির প্রভাবের মধ্যে আবর্তিত হয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই অঞ্চলের জনগণ এবং সামগ্রিকভাবে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের ধারণা। ফিলিস্তিন প্রশ্নে বহু আরব রাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে মুসলিম বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রায়ই নৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানকে ছাপিয়ে গেছে। এই ধারণা সঠিক হোক বা না হোক, বাস্তবতা হলো—এটি আরব নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সম্পর্কও এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কয়েক বছরের সংঘাত, সীমান্ত উত্তেজনা এবং সামরিক মুখোমুখি অবস্থান শেষ পর্যন্ত দেখিয়েছে যে যুদ্ধ কোনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা কমানোর যে প্রচেষ্টা দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে আলোচনার পথ শেষ পর্যন্ত সংঘাতের পথকেই প্রতিস্থাপন করে। এই অভিজ্ঞতা শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের জন্য নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি শিক্ষা।
একইভাবে, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংকটও আরব বিশ্বের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ধীরে ধীরে একমেরুকেন্দ্রিকতা থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় যদি আরব রাষ্ট্রগুলো নিজেদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং একে অপরকে দুর্বল করার কৌশলে ব্যস্ত থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে বহিঃশক্তি; ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যপ্রাচ্যই।
আজ প্রয়োজন সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যকে সংলাপের মাধ্যমে কমিয়ে আনা। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গেও এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা দরকার, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা যুদ্ধের কারণ হবে না। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা ধ্বংসাত্মক সংঘাতে রূপ নেবে না।
এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই—নাকি তাদের ভবিষ্যৎ বারবার বাইরের শক্তির ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতে নির্ধারিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। কারণ প্রতিটি নতুন সংঘাত শুধু সামরিক ক্ষতিই ডেকে আনে না; অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়।
আরব বিশ্বের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার পুনর্গঠন। সেই আস্থা কেবল বক্তব্যে নয়, বাস্তব পদক্ষেপে অর্জিত হবে। আঞ্চলিক সংলাপ, পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, ফিলিস্তিনসহ গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যুতে সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান—এসবই হতে পারে নতুন মধ্যপ্রাচ্যের ভিত্তি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিভক্ত মধ্যপ্রাচ্য কখনোই স্থিতিশীল ছিল না। প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতি বহুবার বাইরের শক্তিকে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু ঐক্য, পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতি এবং কৌশলগত সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
আজকের প্রশ্ন তাই একটাই—আরব রাষ্ট্রগুলো কি অতীতের বিভাজনকে আঁকড়ে ধরে অনিশ্চয়তার পথে এগোবে, নাকি পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিজেদের মধ্যে সমঝোতা গড়ে তুলে একটি আরও স্থিতিশীল, আত্মনির্ভর ও সহযোগিতামূলক মধ্যপ্রাচ্য নির্মাণের পথে হাঁটবে? এই সিদ্ধান্ত শুধু তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নয়, সমগ্র অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের গতিপথও নির্ধারণ করবে। অন্যথায় একই পথে হাঁটতে থাকলে মক্কা-মদিনা কিংবা পবিত্র ভূমির উছিলায় সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিন তাদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে হয়তো ভবিষ্যতে না-ও বাঁচাতে পারে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন