প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধকালীন সহযোগিতা থেকে পাওয়া বিপুল অর্থ উত্তর কোরিয়ার স্বৈরাচারী নেতা কিম জং উনের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
দেশটির অর্থনীতিতে কিছুটা সমৃদ্ধির চিত্র দেখা গেলেও, এর সুফল পাচ্ছে অল্পসংখ্যক মানুষ। বরং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের চাপে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বছরের পর বছর রাতে উত্তর কোরিয়ার স্যাটেলাইট চিত্রে মাত্র কয়েকটি ছোট আলোর ছোপ দেখা যেত। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশটির শহরগুলোও অনেকটা অন্ধকারে পরে থাকত। তবে ২০২০ সালের এপ্রিলের পর গত ছয় বছরে পিয়ংইয়ংয়ের কেন্দ্রস্থলের আলোকিত এলাকার আয়তন তিনগুণ বেড়েছে।
এনকে নিউজের মতে, শহরাঞ্চলের এই বাড়তি আলোকসজ্জা দেখাচ্ছে যে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের সাফল্য তুলে ধরতে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের নতুন রাস্তা ও ভবনগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
২০২১ সালের সর্বশেষ পার্টি কংগ্রেসে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন রাজধানীতে ৫০ হাজার নতুন অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের ঘোষণা দেন। পরে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও শুরু হয়। এর উদাহরণ হিসেবে হোয়াসংয়ের নতুন এলাকায় হোয়াসং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আকৃতিতে দুটি ৪০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে।
নতুন উঁচু ভবন নির্মাণই উত্তর কোরিয়ার পরিবর্তনের একমাত্র চিত্র নয়। দীর্ঘদিন ধরে পিয়ংইয়ং যাতায়াত করা ব্যক্তিরাও বলছেন, শহরটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক মনে হয়।
শহরে চীন থেকে আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। অর্থ পরিশোধ বা ট্যাক্সি ডাকতে কিউআর কোড ব্যবহার করা স্মার্টফোন অ্যাপও রয়েছে। পাশাপাশি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে পশ্চিমা ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও প্রসাধনী সামগ্রীও পাওয়া যাচ্ছে।
শাসকগোষ্ঠী পিয়ংইয়ংয়ে দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল এবং নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের সমান আকারের একটি গ্রিনহাউস নির্মাণ শেষ করেছে। ২০২৫ সালের জুনে কিম পূর্ব উপকূলে আনুষ্ঠানিকভাবে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ওনসান-কালমা সমুদ্রসৈকত রিসোর্ট উদ্বোধন করেন। সেখানে ২০ হাজার অতিথির থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
জুনে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল উত্তর কোরিয়াকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির গল্প’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে পাওয়া বিপুল অর্থেই এই উন্নয়নের বড় অংশের অর্থায়ন হচ্ছে। মার্চে দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের (আইএনএসএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মস্কোর কাছে অস্ত্র বিক্রি ও সৈন্য মোতায়েন করে উত্তর কোরিয়া ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন থেকে ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের সাম্প্রতিক এক হিসাব বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা দিয়ে উত্তর কোরিয়া ১৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছে। এর বাইরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিভিন্ন দেশে উত্তর কোরীয় শ্রমিক পাঠানো, রফতানি ব্যবসা এবং অনলাইন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকেও দেশটি আরও ৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাইবিট প্ল্যাটফর্ম হ্যাকের ঘটনা ছিল বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি ডাকাতি। সন্দেহভাজন উত্তর কোরীয় হ্যাকাররা ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইথেরিয়াম হাতিয়ে নেয়। তুলনা করলে, আগের বছর উত্তর কোরিয়ার মোট জিডিপি ছিল ২৭ বিলিয়ন ডলার।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহারের ধারণাটি রাশিয়া নাকি উত্তর কোরিয়া প্রথম দিয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে কিয়েভের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাশিয়ার রণাঙ্গনে ব্যবহৃত গোলাবারুদের অর্ধেকের পাশাপাশি স্বচালিত কামান, মাল্টিপল রকেট লঞ্চার এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে উত্তর কোরিয়া।
ইউক্রেনের দাবি, বর্তমানে উত্তর কোরিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাশিয়ার কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এতে থাকবে ৯০ জন সৈন্য, ছয়টি লঞ্চ প্যাড এবং সর্বোচ্চ ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্র।
এরই মধ্যে ১৬ হাজার থেকে ২২ হাজার উত্তর কোরীয় সৈন্য রাশিয়াকে সীমান্তবর্তী কুর্স্ক অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সরিয়ে দিতে এবং পরে ওই এলাকা মাইনমুক্ত করতে সহায়তা করছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মতে, কিম এখন রাশিয়ায় আরও ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার সৈন্য পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন।
এই সহযোগিতা বেশ লাভজনক। আইএনএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিম প্রতি মাসে একজন উত্তর কোরীয় সৈন্যের জন্য ২ হাজার ৮০০ ডলার, একজন কর্মকর্তার জন্য ৩ হাজার ডলার এবং যুদ্ধে নিহত প্রত্যেক সৈন্যের জন্য ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার পান।
সোভিয়েত আমলের মতোই এই পারস্পরিক ব্যবস্থা মূলত বিনিময় লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্যের বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য, শস্য এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমেরিন তৈরির প্রযুক্তি পর্যন্ত বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম দিচ্ছে।
রাশিয়ার সমর্থক হিসেবে কিমের নতুন ভূমিকা তাকে আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সামরিক শক্তি দিয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে দুটি ৫ হাজার টন ওজনের ডেস্ট্রয়ারের উদ্বোধনের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
ক্ষমতায় থাকার ১৫ বছরে এই স্বৈরাচারী নেতার হাতে এত প্রভাব বা অর্থ আগে কখনো ছিল না। এটি কিমের জন্য একটি বড় পরিবর্তন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় তার ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। ২০২১ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির কংগ্রেসে অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি স্বীকার করেছিলেন, জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল ‘প্রায় সব ক্ষেত্রেই অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে’।
পাঁচ বছর পর পরবর্তী দলীয় কংগ্রেসে ভবনের বাইরে সাত সারি কামান সাজিয়ে কিম বলেন, ‘সবকিছু মৌলিকভাবে বদলে গেছে।’
রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্ব উত্তর কোরিয়াকে বিশ্ব রাজনীতিতে একঘরে অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতেও সহায়তা করেছে। ২০২৪ সালের জুনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পিয়ংইয়ংয়ে কিমের সঙ্গে দেখা করেন। এর তিন মাস পর বেলারুশের স্বৈরশাসক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো সেখানে সফর করেন।
চলতি বছরের জুনে চীনের নেতা শি জিনপিংও পিয়ংইয়ং সফর করেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বেইজিংয়ের আয়োজনে কিম, শি ও পুতিন একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার এই অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এরই মধ্যে নাজুক অবস্থায় থাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রার জোগান না থাকা অনেক পরিবার খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জাতীয় মুদ্রা ওনের অবমূল্যায়নে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে অনেক পরিবারে নারীদেরও বাইরে কাজ করতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের বসন্তে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের বাইরের অঞ্চলগুলোর জন্য ‘২০x১০’ উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করেন কিম। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন পাওয়া অতিরিক্ত রাজস্ব দিয়ে এই কর্মসূচির অর্থায়ন করা হচ্ছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় প্রতি বছর ২০টি শহর বা অঞ্চলে আধুনিক কারখানা নির্মাণের কথা রয়েছে। ১০ বছরে এর মাধ্যমে মোট ২০০টি আঞ্চলিক শিল্প প্রকল্প গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে সিউলের কুকমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই ল্যাঙ্কভের মতে, অধিকাংশ ২০x১০ প্রকল্পই ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেন, এর কারণ শুধু কারখানার অবকাঠামোর অভাব নয়; বিদ্যুৎ, সরঞ্জাম ও কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থাও এসব প্রকল্পে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
কারখানাগুলো পরিকল্পিত অর্থনীতির নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে, যা ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য উপযোগী নয়। ল্যাঙ্কভ বলেন, ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি উত্তর কোরিয়ায় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, তার বিপরীতে বর্তমান প্রবৃদ্ধি কোনো অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের ফল নয়। বরং এটি পুরোপুরি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি থেকে পাওয়া সুবিধার ওপর নির্ভরশীল।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন