প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মুজাহিদপুর গ্রামের কামরুজ্জামান। ২০২৪ সালে ১৫ লাখ টাকায় তাঁকে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তার পরিণতি ছিল এক ভয়াবহ মানব পাচারকারী চক্রের হাত থেকে জিম্মি হওয়া।
পাচারকারী চক্রের হাতে কামরুজ্জামানকে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে জিম্মি করে আদায় করা হয় আরো ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ। সম্প্রূক্তিপণসহ সব মিলিয়ে ওই চক্র থেকে তাঁর কাছে ২৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত স্বপ্নের দেশ ইতালিতে পৌঁছানোর সুযোগ আর হয়নি।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের বাসিন্দা ইমরান হোসেনও মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়তেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাচারকারী চক্র তাঁকে প্রথমে বিমানে কুয়েতে পাঠায়, পরে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। পাচারকারীদের হাতে তিনি প্রথমে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। পরে তাঁকে লিবিয়ায় জিম্মি করে পা ফুটো করার মতো নির্যাতন করে আদায় করা হয় ১৯ লাখ টাকা।
জিম্মি দশায় এক বছর নির্যাতনের পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাহায্যে দেশে ফিরতে সক্ষম হন ইমরান। কামরুজ্জামান বা ইমরান হোসেনের মতো হাজারো যুবক মানব পাচার চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। একটি গবেষণা অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩০ হাজার যুবককে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাচারকারীরা লিবিয়ায় নিয়ে যায়। হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণ বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
সম্প্রতি ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জার্মানির ‘রবার্ট বোশ স্টিফটুং’ ফাউন্ডেশন 'মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার (এমএমসি)' আন্তর্জাতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে লিবিয়া হয়ে বাংলাদেশি অভিবাসীদের ইতালি যাওয়ার পেছনে গা-ভর্তি অর্থের লেনদেনের তথ্য তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ১৪ হাজার বাংলাদেশি সমুদ্রপথে ইতালি পৌঁছান। পাচারকারী চক্র দ্বারা আদায় করা অর্থের মূল্য ছিল ১৬০ থেকে ১৯০ মিলিয়ন ডলার, যা প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
‘জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার’-এর বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের মতে, প্রতিবছর গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় যাবার চেষ্টা করে। তাঁদের মধ্যে কিছু অংশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইতালি পৌঁছান, বাকিরা লিবিয়ায় জিম্মি থেকে দেশে ফিরে আসেন।
লিবিয়ার বন্দি বাংলাদেশি অভিবাসীদের ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। সম্প্রতি তারা ১৭৪ জন বন্দিকে দেশে ফিরিয়ে আনে। এছাড়া এমএমসির তথ্যানুযায়ী, পাচারকারী চক্র আরো বেশি সংগঠিত হয়ে উঠেছে। তারা সামাজিক অনুষ্ঠান বা চায়ের দোকানে নির্দিষ্ট লোকদের টার্গেট করে সখ্য গড়ে তোলে।
পাচারকারী চক্র নানা ধরনের ‘প্যাকেজ’ অফার করে, যেমন স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজ এবং অল-ইনক্লুসিভ প্যাকেজ। কিন্তু বাস্তবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরেও লিবিয়ায় জিম্মি হতে হয়। বিগত সময়ে যে যুবকরা ইতালির উদ্দেশে দেশ ছাড়ছেন, তাঁদের মাত্র ৩০ শতাংশ সফল হয়ে ইতালি পৌঁছান।
এমএমসির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে কিছু সুপারিশ রয়েছে, যেমন মানব পাচারকারী রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা, সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে যারা পাচার বিজ্ঞাপন দেয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখায় পাচারচক্র ভাঙার উদ্যোগ নেয়া।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মানবপাচার রোধে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ইতালিতে মানব পাচার কমেছে এবং আরো কমানোর চেষ্টা চলছে।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন