প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দীর্ঘ ৩৫ বছরের বিরতি ভেঙে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও অনিশ্চয়তায় পড়েছে এর ভবিষ্যৎ। বর্তমান কমিটির এক বছরের মেয়াদ শেষ হলেও প্রশাসনের তরফ থেকে পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের জন্য কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন সদ্য সাবেক রাকসুর নেতারা, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাসের ছাত্র সংগঠনগুলো।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জুলাই মাসে রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে ভোটগ্রহণের তারিখ সেপ্টেম্বর মাসে নির্ধারণ করা হলেও, কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ১৬ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্যানেলটির ২৪ দফা ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল রাকসু নির্বাচনকে ক্যালেন্ডারভুক্ত করা। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর। বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান।
তিনি বলেন, "এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে উপাচার্যের ওপর। তিনি যখন মনে করবেন, তখনই নির্বাচন হবে।" উপাচার্য আমাকে আগের নির্বাচনের অবস্থা, কারা দায়িত্বে ছিলেন এবং কী কী সমস্যা ছিল সেসব তথ্যসহ একটি ফাইল দিতে বলেছিলেন। আমি সে অনুযায়ী তাকে ফাইল দিয়েছি।
সেতাউর রহমান বলেন, "তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, শিক্ষার্থীরা নির্বাচন আয়োজনের জন্য চাপ দিচ্ছেন।" সেই প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আলোচনার মধ্যে রাখার অংশ হিসেবে হয়তো এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া প্রয়োজন, তার কিছুই এখনো দৃশ্যমান নয়।
তবে রাকসুর বর্তমান নেতাদের দাবি, নির্বাচন আয়োজনের জন্য তারা প্রশাসনের কাছে নিয়মিত দাবি জানিয়ে আসছেন।
রাকসুর সাবেক এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, "পরবর্তী রাকসু যাতে ধারাবাহিকভাবে চালু থাকে, সেটি আমাদের ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল।" এ লক্ষ্যে তৃতীয় অধিবেশন থেকেই উপাচার্যকে বিষয়টি জানিয়ে আসছি। সর্বশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অধিবেশনে উপাচার্য বর্তমান কোষাধ্যক্ষকে নির্বাচনের তফসিল প্রণয়ন ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছেন। এ দুটি বিষয়ে দ্রুত তাকে হালনাগাদ তথ্য জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, "কোষাধ্যক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তফসিল ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে।" আমরা কোষাধ্যক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। আশা করছি, শিগগিরই এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানাতে পারব।
রাকসুর সাবেক জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, "রাকসু আদায় করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।" আমার ইশতেহারেও রাকসু সচল রাখার প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
রাকসুর সাবেক ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, "রাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছি এবং প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছি।" তবে আমাদের মনে হচ্ছে, প্রশাসন দলীয় সরকারের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, "প্রশাসন অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দিলেও রাকসু নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।" নির্বাচনের তিন মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতি নেই। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তারা জানায় ছাত্ররা চাইলে নির্বাচন হবে।
জাহিদ আরো বলেন, "ছাত্ররা যে নির্বাচন চায়, সেটি তো গত নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়েছে।" আমাদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে প্রশাসন নির্বাচন না দেওয়ার পথ তৈরি করছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, "নির্বাচন নিয়ে আমরা অবশ্যই ভাবছি।" আমরা সব সময়ই চাই ছাত্র সংসদ থাকুক ও নির্বাচন হোক। তবে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। শুধু সময় হলেই নির্বাচন করা সম্ভব নয়, সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অনুকূলে থাকতে হয়। যখন রাকসু নির্বাচনের পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টি হবে, তখনই নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবি
রাকসুর নির্বাচন ও কার্যক্রম ধারাবাহিক রাখার দাবি জানিয়েছেন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারাও। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব বলেন, "রাকসু ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চা অক্ষুণ্ণ রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।" শিক্ষার্থীদের লিগ্যাল প্ল্যাটফর্ম বলা যায়। প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যে সেতুবন্ধন, সেটির জন্যও রাকসু গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে চাই, রাকসু নির্বাচন অব্যাহত থাকুক।
তিনি আরো বলেন, "রাকসুর মেয়াদ শেষ হয়েছে।" তাই অনতিবিলম্বে পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা উচিত। প্রশাসন পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা বলছে। কিন্তু ক্যাম্পাসে এমন কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি, যার কারণে রাকসু নির্বাচন দিলে পরিবেশ ঘোলাটে হবে। আমরা স্মারকলিপির মাধ্যমে আবারও দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি জানাব।
শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু বলেন, "স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচন তথা ছাত্র সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে রাজনৈতিক সহাবস্থান জরুরি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরের অপর নাম ছাত্র সংসদ নির্বাচন। এটি শুধু ছাত্রদল নয়, প্রতিটি সংগঠনের কাছেই জনপ্রিয় দাবি। আমরা বরাবরই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী। রাকসুর এই ধারা অব্যাহত থাকুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, "এবারের রাকসু প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাকসুর প্রয়োজন রয়েছে।" আগামীতে শিক্ষার্থীরা সচেতনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করলে এর মাধ্যমে ভালো কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান, আপনারা রাকসুর দাবিতে সোচ্চার হোন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন