প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মনে হচ্ছে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া রেজোলিউশন তৈরি, আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষকদের মানসিকভাবে হয়রানি এবং নারী শিক্ষকের পোশাক নিয়ে প্রকাশ্যে কটূক্তির মতো একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের পর ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান তদন্ত করেছেন।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে ইউএনও বিদ্যালয়ে যান। সেখানে তিনি অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন। অভিযোগের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। ইউএনও তদন্তকালে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানসিক হয়রানি তুলে ধরেন শিক্ষকেরা।
বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষক সেলিনা আক্তার অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক প্রকাশ্যে তার পোশাক নিয়ে কটূক্তি করেছেন। পাশাপাশি তার অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ রাখার অভিযোগও করেছেন। এইসব কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক কষ্টে রয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ রয়েছে যে বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না। তারা জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রশিদ ও যথাযথ ভাউচার ছাড়াই বিদ্যালয়ের বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ওই অর্থের ব্যয় ও হিসাবের যথাযথ উপস্থাপন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা।
অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন ভাউচারে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। কিছু শিক্ষক স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কাজে বাধার অভিযোগে অভিযুক্ত করা এবং সামাজিকভাবে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখিত হয়েছে যে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া রেজোলিউশন ও বিভিন্ন নথিপত্র তৈরি করে শিক্ষকদের হয়রানি করা হয়েছে। শিক্ষক শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি। একইভাবে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের কাছ থেকেও ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেন, পরে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মো. শাহ আলমের স্বাক্ষর জাল করে সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদা বেগমের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। ওই মামলার পর তার সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তখন থেকে তিনি প্রায় পাঁচ মাস ধরে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম থেকে দূরে রয়েছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয় যে, ফারজানা আক্তার নিপা নামের একজনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্যারা-টিচার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রাইভেট ও কোচিং পড়তে বাধ্য করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, ওই কোচিং থেকে প্রধান শিক্ষক কমিশন হিসেবে অর্থ গ্রহণ করতেন।
এদিকে, ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি লিয়াকত আলী তালুকদারের করা মামলায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগকারী শিক্ষকরা দাবি করেন, তদন্ত শেষে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও অন্যান্য তহবিলের অর্থ নিয়ে। তারা দাবি করেন, প্রতিদিন শিক্ষার্থী ও অন্যান্য উৎস থেকে জমা হওয়া অর্থ প্রধান শিক্ষক নিজ বাসায় নিয়ে যান এবং স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে অভ্যন্তরীণ বেতন বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া বিদ্যালয়ের স্থায়ী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না খুলে প্রধান শিক্ষক নিজে একক নামে অ্যাকাউন্ট খুলে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই অ্যাকাউন্টে বিদ্যালয়ের অর্থ জমা ও উত্তোলনের বিষয় সম্পর্কে তথ্য জানানো হয়নি।
শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময়ও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের টিসি বা ছাড়পত্রের জন্যও অর্থ আদায় করার অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের সংস্কার ও অন্যান্য কাজের কথা বলেও শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অর্থের যথাযথ হিসাব বা ব্যবহার দেখানো হয়নি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, এসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য যে, প্রধান শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান তদন্তে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি। তিনি জানান, অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান জানিয়েছেন, অভিযোগগুলি পর্যালোচনা করে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি আরও অধিকতর তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি জানান, তদন্ত কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন