প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভূমিকম্পে হারানো স্বজনের খোঁজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন ভেনেজুয়েলার ইকুয়েডর, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানিতে অবস্থানরত ভেনেজুয়েলার নাগরিক মারিয়া পেসিনা তাঁর ভাইবোনদের সঙ্গে গত আট দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন চ্যাট গ্রুপে তাদের মাকে খুঁজে ফিরছেন। প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, চার দিনের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর একটি ছবি তাঁদের সবচেয়ে আশঙ্কার খবরটি নিশ্চিত করে, ‘তাদের মা ম্যাগনোলিয়া কারাকাসে ভবন ধসে নিহত হয়েছেন।’ ‘যন্ত্রণার অবসান হলো,’ বলে মন্তব্য করেন পেসিনা, ৭৯ বছর বয়সী মায়ের মরদেহের গায়ে থাকা পোশাক দেখে পরিচয় নিশ্চিত করার পর এএফপিকে। ইকুয়েডরের রাজধানী কুইটোতে কর্মরত এই ভেনেজুয়েলীয় গবেষক নিজের দিক থেকেও ওই দুর্ঘটনার শিকার হতে পারতেন। তিনি তিন সপ্তাহ ধরে মায়ের সঙ্গে কাটিয়ে ২৪ জুন দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে বিমানে ওঠেন। বিমান ওঠার পর কয়েক ঘণ্টা পরই ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার যুগ্ম ভূমিকম্প আঘাত হানে। ‘ভূমিকম্পটি সংঘটিত হওয়ার সময় আমি বিমানে ছিলাম,’ বলেন তিনি। অবতরণের পর, ‘আমার ফোনে বার্তার এক ভূমিকা বয়ে যায়। সবাই ভেবেছিল আমি এখনও কারাকাসেই আছি।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাড়ি পৌঁছানোর আগেই ধসে পড়া ভবনের একটি ভিডিও হাতে পাই। তখন আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।’ এরপর তিনি ও তার ভাইবোনেরা মরিয়া হয়ে মায়ের খোঁজ শুরু করেন। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের চ্যাটগ্রুপে তথ্য চান। একই সঙ্গে একজনকে নিয়োগ করেন, যিনি কারাকাসের বিভিন্ন হাসপাতালে জীবিত, আহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা খুঁজে দেখেন। হোয়াটসঅ্যাপের একটি গ্রুপের মাধ্যমে ম্যাগনোলিয়ার বসবাস করা ১৪ তলা ‘পেটুনিয়া’ ভবনের বাসিন্দারা যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, পানামা ও ইকুয়েডরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। শুক্রবার ওই গ্রুপে একটি বার্তায় জানানো হয়, ম্যাগনোলিয়ার বর্ণনার সঙ্গে মিলে এমন একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। পরদিন পোশাক দেখে নিশ্চিত হন সেটি তাঁর মায়ের মরদেহ। পেসিনা বলেন, ‘তিন সপ্তাহ ধরে আমি তার কাপড় ধুয়ে গুছিয়ে রেখেছিলাম। তাই ছবিতে তিনি কী পোশাক পরেছিলেন, তা চিনতে পেরেছি।’ ঘুম হারাম হয়ে গেছে পেসিনা পরিবারের মতো আরও অসংখ্য প্রবাসী ভেনেজুয়েলীয় দূরদেশ থেকে স্বজনদের খুঁজছেন। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন এবং এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রায় ৭৯ লাখ মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এটি সাম্প্রতিক লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জনপলায়ন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা এই প্রবাসীরা ওষুধ, ডায়াপার ও শিশু খাদ্য পাঠানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে আবেদন জানাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি থেকে এএফপিকে আন্দ্রে (পূর্ণ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, তার ভগ্নিপতি প্লায়া গ্রান্দের ভায়ার্তা ভবনে ছিলেন। ‘এখনও তার কোনো খবর পাইনি,’ বলেন তিনি। ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা অঞ্চলের ওই এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দারাই উদ্ধারকাজ চালান। পরে এল সালভাদরের উদ্ধারকারী দল সেখানে যোগ দেয়। আন্দ্রে বলেন, ‘এই বিপর্যয়ের পর থেকে আমি ঘুমাইনি। সাহায্যের আবেদন জানাই, অনুদান সংগ্রহ করি, মানুষকে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিই। সবকিছুরই প্রয়োজন, আর আমার কাছে হাজার হাজার বার্তা আসছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, মঙ্গলবার তার ভগ্নিপতির ভবনে উদ্ধার অভিযান স্থগিত হয়ে যায়, কারণ স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ থেকে অর্থ চুরির সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন। ‘তারা মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সময়মতো আসেনি। হয়তো প্রথম কয়েক ঘণ্টায় আমার ভগ্নিপতি জীবিত ছিলেন। কিন্তু চুরি করতে তারা ঠিকই সময়মতো এসে গেছে,’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আন্দ্রে। শরীর এখানে, মন পড়ে আছে ওখানে স্পেনে বসবাসরত ব্রোলি রুম্বোস জানতে পারেন, তার এক বন্ধু লা গুয়াইরার ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের পরিবারের সদস্যদের খুঁজেছেন। স্কুলজীবনের বন্ধুদের চ্যাটগ্রুপে তিনি লেখেন, ‘এত দূরে থেকে স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়া খুব অদ্ভুত লাগে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘আমরা এখানে আছি, কিন্তু আমাদের মন পড়ে আছে ওখানে।’ এদিকে পেসিনা পরিবার এখন ভাবছে, কীভাবে তাঁদের মাকে শেষ বিদায় জানানো হবে। ম্যাগনোলিয়ার দেহভস্ম তার বোনদের কাছে পৌঁছানোর পর সম্ভবত অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। পেসিনা বলেন, ‘কবে হবে, জানি না। এখন সবকিছুই সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল।’ তবে একটি বিষয়ে তিনি নিশ্চিত—শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে গান থাকবে। কারণ, ‘আমার মা গান গাইতে খুব ভালোবাসতেন।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন