প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মধুমতি নদীর পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। নদীর তীরবর্তী টগরবন্দ, গোপালপুর, বুড়াইচ, বানা ও পাচুড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বসতবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা, সড়ক ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে অন্তত ৩০০ পরিবার ভাঙনঝুঁকিতে পড়েছে। একইসাথে একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদ্রাসা, মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও চরম হুমকির সম্মুখীন রয়েছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, টগরবন্দ ইউনিয়নের টিঠা-পানাইল, ইকড়াইল, কৃষ্ণপুর, শিকারপুর, চরডাঙ্গা, চাপুলিয়া ও কুমুরতিয়া; গোপালপুর ইউনিয়নের দিগনগর, চর আজমপুর, কাতলাসুর ও সাতিয়ারগাতি; বুড়াইচ ইউনিয়নের চরখোলাবাড়িয়া; বানা ইউনিয়নের পণ্ডিতের বানা ও বেল বানা এবং পাচুড়িয়া ইউনিয়নের চরনারান্দিয়া, বাঁশতলা ও চান্দ্রাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয়দের দাবী, চলতি মৌসুমে এসব এলাকায় প্রায় ২০টি পরিবারের বসতভিটা, গাছপালা ও ফসলি জমিসহ ২০ থেকে ৩০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেমাটি হারিয়ে কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, চাপুলিয়ার পাঁচটি সরকারি আশ্রয়ের ঘর নদী গর্ভে চলে যাওয়ায় সেখানে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাথার উপরে পলিথিন দিয়ে বসবাস করছে কয়েকটি পরিবার, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ নিজের শখের ঘর ভাঙতে ব্যস্ত রয়েছেন।
শিকারপুরের বাসিন্দা মুসা মিয়া (৬৫) বলেন, “এবার নদীর ভাঙন আমাদের উঠান পর্যন্ত চলে এসেছে। তড়িঘড়ি করে ঘরবাড়ি ভেঙে সরাতে পেরেছি। তাদের দাবি আর হয়তোবা দুই এক দিন গেলে ঘরের একটুকু খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু অনেক গাছপালা নদীতে চলে গেছে। এখন ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।” একই এলাকার কাছেদ মল্লিক (৭০) বলেন, “আমরা এখন সবসময় আতঙ্কে থাকি, কখন বসতভিটাটুকুও নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এ পর্যন্ত আটবার নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা পরিবর্তন করেছি। এবার ভেঙে গেলে আমাদের মাথা গোঁজার মতো আর কোনো জায়গা থাকবে না।”
স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল শেখ (৩৫) বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ অঞ্চলের চার থেকে পাঁচশ পরিবার মধুমতির ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে পারে।” স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. মোরাদ হোসেন বলেন, “প্রতি বছরই প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরিবার এবং ২০ থেকে ৩০ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রতিবছর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে আবেদন জানাই। তারা এসে পরিদর্শন করে আশ্বাস দেন, কিন্তু এখনো স্থায়ী কোনো প্রতিকার পাইনি।”
তিনি বলেন, “বাজড়া, চর আজমপুর, চাপুলিয়া, চরদনাইড়, শিকিপাড়া, শিকারপুর, কুমুরতিয়াসহ প্রায় ১০টি গ্রাম নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি গ্রামের মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ গোপালপুর-চরহাঙ্গা পাকা সড়কের প্রায় ৫০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, চাপুলিয়া গুচ্ছগ্রাম ও আশ্রয়ণ কেন্দ্রের ৬৫টি ঘর, বাজড়া পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদ এবং চর আজমপুর গ্রামের প্রায় ৩০টি বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। এদিকে এখনো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে এনবিডিসি আলহেরা দাখিল মাদ্রাসা, দিগনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিকারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাজড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এনবিডিসি আলহেরা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আব্দুর রব বলেন, “আলফাডাঙ্গার প্রত্যন্ত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই দাখিল মাদ্রাসাটি নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রতিষ্ঠানটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন প্রতিরোধে কিছু এলাকায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হলেও কোথাও কোথাও বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা না হলে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলাকা বাসীর দাবি, নদীভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এতে বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকটি গ্রামের মানুষ মধুমতির ভাঙন থেকে রক্ষা পাবেন।
এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এম রায়হানুর রহমান বলেন, “এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি দ্রুতই একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন