প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশ এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরো গভীর এবং বহুমাত্রিক করার লক্ষ্যে নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (এমএফএটি) সদর দপ্তরে একটি উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন কামনা করেছে—রিজিওনাল কম্প্রেহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-তে সদস্যপদ লাভ, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত তিন বছর সময় এবং বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ডের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন।
নিউজিল্যান্ডের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড এবং ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হল্যান্ড। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। প্রতিনিধিদলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ উইংয়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতেই বাংলাদেশ সরকার এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা নিউজিল্যান্ডের কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে, দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ জানায় যে সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলীর জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে এবং আরসিইপির উচ্চমানের বাণিজ্যিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে শিল্পখাতের জন্য কাঁচামাল এবং উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক হ্রাস, সেবা খাতে ‘পজিটিভ লিস্ট’ থেকে ‘নেগেটিভ লিস্ট’ পদ্ধতিতে রূপান্তর এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষা বিষয়ে আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা।
আরসিইপির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন কামনা করে বাংলাদেশ। পাশাপাশি সংবেদনশীল শিল্প এবং পণ্য খাতের জন্য আসিয়ানভুক্ত এলডিসি দেশগুলোর মতো ১৫-২০ বছরের ধাপে ধাপে শুল্ক সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের কাছে এলডিসি উত্তরণ ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করার যে আবেদন করেছে, তার পক্ষে নিউজিল্যান্ডের সমর্থন চাওয়া হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক দামস্ফীতির কারণে উত্তরণ-প্রক্রিয়ায় থাকা অর্থনীতিগুলো উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আর্থ-সামাজিক পুনর্গঠন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীলকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জানায়, এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করার কোনো উদ্দেশ্য নেই; বরং অতিরিক্ত সময়কে টেকসই ও সুসংগঠিত প্রস্তুতির সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
দ্বিপাক্ষিক এফটিএ আলোচনার অগ্রগতি
বৈঠকে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। ডব্লিউটিওর ১৪তম মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন (MC-14) উপলক্ষে দুই দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এফটিএ আলোচনা শুরু করার আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করে।
বাংলাদেশের মতে, এফটিএ কার্যকর হলে নিউজিল্যান্ডের জন্য বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বৃহৎ বাজারে দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষিযন্ত্র এবং ধাতব পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিউজিল্যান্ডের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি এবং পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকার পাবে।
ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য তিনটি প্রস্তাব
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ সহযোগিতা জোরদারে তিনটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে—
১. আরসিইপি, এলডিসি-পরবর্তী বাজার সুবিধা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ পর্যালোচনার জন্য একটি বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নীতি পরামর্শক গ্রুপ গঠন;
২. এফটিএ আলোচনার প্রথম ধাপ হিসেবে দুই দেশের সমন্বয়ে একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন;
৩. জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের আবেদনের পক্ষে সমর্থন নিশ্চিত করতে নিউইয়র্কে দুই দেশের স্থায়ী মিশনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদার করা।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আশা প্রকাশ করে যে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
বৈঠকে উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের নীতি-সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে। এ সময় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল নিউজিল্যান্ডের নীতিনির্ধারকদের বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানায়। নিউজিল্যান্ড কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন