প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলা সাহিত্যের প্রতিবাদী ও গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের আয়োজনে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বক্তারা এই অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেছেন, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায় শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন প্রকাশিত হয়েছে। তার জন্মশতবর্ষে সেই স্বপ্ন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সুকান্তের কবিতা, জীবনদর্শন ও সংগ্রামী চেতনার প্রাসঙ্গিকতা সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে।
চট্টগ্রাম নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সমাগম ঘটে।
সভায় কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, ষাটের দশককে কেন্দ্র করে প্রগতিশীল সমাজ প্রগতির আন্দোলনের যে কল্পচিত্র তৈরি হয়েছে, তাতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং সুকান্তের অবদান সবচেয়ে বড়। সুকান্ত ছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ ও স্বল্পায়ু। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি কীভাবে এত শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন, তা বিস্ময়কর। তিনি যেন এলেন এবং ধূমকেতুর মতো মিলিয়ে গেলেন। তবে তিনজনই আমাদের পথচলার অনুপ্রেরণা। তাদের সৃষ্টিকর্মগুলো যদি আমরা একত্রিত করি, তাহলে একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থার কথা উঠে আসে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা সেই সমাজব্যবস্থা গড়তে পারিনি।
তিনি আরও বলেন, একাত্তর আমাদের একটি সুযোগ দিয়েছিল। ভারত আমাদের সহযোগিতা করেছিল। কিন্তু অর্ধশতক পেরিয়ে দেখছি যে, সেই চেতনাকে আমরা পরাজিত করেছি এবং পাকিস্তানি মানসিকতা আমাদের ওপর চেপে বসেছে। আমরা মানুষের মননকে গঠন করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি বরাবর তৎপর ছিল এবং আছে। কিন্তু আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, আমাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবিচল থাকতে পারিনি।
আবুল মোমেন বলেন, বর্তমানের তরুণরা সুকান্তের কবিতা পড়ছে না। তারা সাহিত্য পড়ছে না। তাদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেখানেও রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলো পুরোপুরি পড়তে হয় না। শুধু প্রশ্ন ও উত্তরগুলো পড়ে পরীক্ষায় লিখলেই চলে। এখন কোনো উপন্যাস না পড়েও বাংলা সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স পাস করা যায়। ইংরেজি সাহিত্যেও পাস করা যায়। সাহিত্যপাঠ ছাড়াই, বই না পড়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। তাহলে জাতি এগোবে কীভাবে! সর্বনাশটা হয়ে গেছে শিক্ষায়। পড়া হতে হবে নিরীক্ষামূলক, আনন্দদায়ক। আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তকে আবার স্কুলে ঢুকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আজকের প্রজন্ম সাহিত্য বোঝে না। রবীন্দ্রনাথ বোঝে না। রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল এগিয়ে অসাম্প্রদায়িক চিন্তার সাহিত্যচর্চায়। কিন্তু প্রজন্ম নজরুলকে একজন মুসলমান হিসেবে মনে রাখছে। সুকান্তকে তো ঝেড়ে ফেলেছে। আজকের প্রজন্ম নিজেদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তের উত্তরসূরি মনে করে না। আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তকে নিয়ে আবার স্কুলে ঢুকতে হবে।
প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক সুভাষ দে বলেন, সুকান্ত আমৃত্যু মার্কসবাদী দর্শনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি সমাজ বিপ্লবের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। বিপ্লবী সংশপ্তকের মতো। বিপ্লবের ঠিকানা তিনি নানা কবিতায় দিয়েছেন। সৃষ্টির ওপর ভর করে চারপাশের সময় তাকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যে বিপ্লবের কন্ঠস্বর সুকান্ত। শোষিত শ্রমজীবী মানুষের জীবনের লড়াইয়ে সুকান্তই হবেন অন্যতম আশ্রয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, প্রযুক্তির উল্লম্ফনে মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে গেছে। চিন্তার জগত পরিবর্তন হয়ে গেছে। বাম রাজনীতির মধ্যেও নানা ধরনের নতুন চিন্তা দেখা যাচ্ছে। এ জায়গায় সুকান্তকে প্রাসঙ্গিক রেখেই এগিয়ে যেতে হবে। নতুনভাবে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তার জগতকে সাজাতে হবে।
কবি ও নাট্যজন অভীক ওসমান বলেন, একজন কিশোর কবি পুরো ভারতবর্ষকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে সুকান্তকে আমরা আমাদের লড়াই-সংগ্রামে কতটা প্রাসঙ্গিক রাখতে পেরেছি, সেটি ভাবতে হবে। এক সময় গ্রামগঞ্জে রবীন্দ্র, নজরুল ও সুকান্তের জন্মজয়ন্তী হতো। এখন তো বিলুপ্তপ্রায়। তাহলে আমরা যে সমাজকে পাল্টানোর কথা বলি, সেটি কীভাবে হবে।
উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা অমল কান্তি নাথের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শীলা দাশগুপ্তার সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন কবি ইউসুফ মুহাম্মদ ও কেন্দ্রীয় উদীচীর সহসভাপতি বেলায়েত হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সদস্য শিমুল সেন।
সাংস্কৃতিক পর্বে উদীচী ও রাগেশ্রীর শিল্পীরা দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন। সুরাঙ্গন পরিবেশন করে ‘রানার’ শিরোনামের নৃত্য। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও বোধন দলীয় আবৃত্তিতে অংশ নেয়। একক আবৃত্তিতে অংশ নেন সোমা মুৎসুদ্দি, অঞ্চল চৌধুরী, ফারুক তাহের ও বেলায়েত হোসেন। একক গান পরিবেশন করেন জয় নেন, ভাস্কর রায়, বিউটি দেব ও বর্ণালী দাশ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন