প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২০০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গত পাঁচ দশকে এই ধরনের দিনে সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
বিশ্বের যেসব দেশে মানুষেরা সবচেয়ে বেশি সময় ঝুঁকিপূর্ণ তাপ ও আর্দ্রতার মাঝে অবস্থান করছে, বাংলাদেশ তাদের একটি।
বুধবার (২৪ জুন) আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রালের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে বিশ্বজুড়ে বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বে বছরে গড়ে ১০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার ঘটনা ছিল, কিন্তু ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তা বেড়ে ২৩ দিনে পৌঁছেছে।
১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বে রেকর্ড হওয়া এমন দিনের প্রায় ৬৪ শতাংশ ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা সরাসরি রয়েছে।
বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। ২০১৬-২০২৫ সালে দেশে বছরে গড়ে ২০০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকে এই সংখ্যা ছিল ১৭৫ দিন।
অর্থাৎ, বর্তমানে দেশের জনসাধারণ বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় এমন তাপ-আর্দ্রতার শিকার হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে অতিরিক্ত ৩০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকে এই সংখ্যা মাত্র ৫ দিন ছিল। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার অংশ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
দেশের বড় শহরগুলোতে এই প্রভাব আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
রাজধানী ঢাকা বছরে গড়ে ২১০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা অনুভব করে। যার মধ্যে ২৫ দিন সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে বছরে গড়ে ২১১ দিন এমন তাপমাত্রা দেখা যায়, এর মধ্যে ৩৬ দিন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যোগ হয়েছে। খুলনায়, এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—বছরে গড়ে ২২৪ দিন।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শুধু উচ্চ তাপমাত্রা নয়, বাতাসের আর্দ্রতাও মানবদেহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলে ঘামের মাধ্যমে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে পানিশূন্যতা, তাপজনিত অবসাদ, হিট স্ট্রোক, হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং পূর্বে অসুস্থ ব্যক্তি বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছেন।
কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. শিমুল মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব পড়ছে। শিশুদের মধ্যে কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমাসহ শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগের সংখ্যা বাড়ছে। আগের বছরের তুলনায় অ্যাজমা ও সংশ্লিষ্ট শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ডাক্তাররা বলছেন, তাপপ্রবাহের প্রভাব কেবল তাপজনিত অসুস্থতায় সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘস্থায়ী গরমের সময় অধিক পানি পান করতে গিয়ে অনেকেই অনিরাপদ পানির উৎসের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। এতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাশেদুল হাসান বলেন, বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি করছে। গরমের সময় মানুষ অধিক পানি পান করলেও অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো রোগের প্রকোপ বাড়ছে।
বিশ্বব্যাপী চরম তাপমাত্রা ইতিমধ্যে অনেক প্রাণঘাতী আবহাওয়ার সংক্রান্ত দুর্যোগগুলোর মধ্যে একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী চরম তাপমাত্রার ফলে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সতর্কবার্তা হচ্ছে, বাড়তে থাকা আর্দ্রতা তাপপ্রবাহকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে এবং অনেক অঞ্চলে পরিস্থিতিকে মানবদেহের সহনক্ষমতার সীমানার কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এই ঝুঁকি মোকাবেলায় তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা জোরদার করা, শ্রমিক সুরক্ষা বৃদ্ধি, নগর এলাকায় শীতলীকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু-সহনশীল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ আরও জরুরি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন