প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নতুন হিজরি বর্ষের সূচনা ঘটেছে। মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ নতুন বছরের প্রথম মাস মুহাররম অতিক্রম করছে। তবে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে হিজরি নববর্ষ হলো কোনো উৎসব বা উদযাপনের সময় নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ক্যালেন্ডারের পাতা পাল্টানো কেবল সংখ্যার পরিবর্তন নয়; বরং মানুষের জীবনের একটি বছর কমে যাওয়ার বাস্তবতা। নতুন বছর আমাদের মনে করে দেয়, জীবনদৃষ্টিতে আমরা পরকালের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে গেছি। অতএব একজন মুমিনের কাছে নতুন বছরের প্রকৃত তাৎপর্য হলো নিজের আমল, দায়িত্ব এবং জীবনযাত্রার হিসাব-নিকাশ করা।
মুহাররম হলো ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের একটি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত মাস।" (সুরা তাওবা : ৩৬)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, সম্মানিত চার মাস হলো জিলকদ, জিলহজ, মুহাররম এবং রজব। এই মাসগুলোতে নেক আমলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
ইসলামি ইতিহাস অনুযায়ী মুহাররম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। মুসলিম ঐতিহ্যে এ মাসকে কেন্দ্র করে বহু ঐতিহাসিক ঘটনার আলোচনা পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে প্রচলিত বহু বর্ণনা দুর্বল বা অপ্রমাণিত হওয়ায় মুসলমানদের উচিত নির্ভরযোগ্য সূত্রের ওপর নির্ভর করা এবং ভিত্তিহীন গল্প ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মুসলিম সমাজের কিছু অংশের মধ্যে মুহাররমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার, অতিরঞ্জন ও শরিয়তবহির্ভূত আচরণের চর্চা দেখা যায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো ধর্মীয় বিষয়ে আবেগ নয়, বরং কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনাই হবে চূড়ান্ত মানদণ্ড।
মুহাররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রমাণিত আমল হলো আশুরার রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দিনের রোজার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। হাদিসে জানা গেছে, রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা মুসলমানদের জন্য আবশ্যক ছিল। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা নফল হিসেবে অবশিষ্ট থাকে।
হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। পরে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এ বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরও কমে যায়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১২৮)
আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২)
হাদিসে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু ১০ মুহাররম নয়; বরং ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম মিলিয়ে দুই দিন রোজা রাখা উত্তম। এর মাধ্যমে মুসলমানদের আমল অন্য ধর্মাবলম্বীদের আমল থেকে স্বতন্ত্র হয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আশুরার রোজা এবং রমজানের রোজা ছাড়া অন্য কোনো রোজার প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এত গুরুত্ব দিতে দেখিনি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০০৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৩২)
নতুন হিজরি বর্ষ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, গত এক বছরে আমরা কী অর্জন করেছি? আমাদের ঈমান, আমল, চরিত্র ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে? একজন মুমিনের জন্য এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা নতুন বছরের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।
আজকের দিনে প্রয়োজন হিজরি সনের ইতিহাস ও এর গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করা। কারণ একটি জাতি যদি তার ইতিহাস ভুলে যায়, তবে তার পরিচয়ও দুর্বল হয়ে পড়ে। হিজরি সন হলো কেবল একটি তারিখ নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয়ের একটি অপরিহার্য অংশ।
তাহলে নতুন হিজরি বর্ষকে উৎসবের ধরনের না দেখে, বরং আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত সচেতন মুমিনের দায়িত্ব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন