প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বাকডোকরা খাল খনন প্রকল্পের অধীনে বর্তমানে কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু, সম্প্রতি এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খননে দায়সারা ভাবে কাজ হচ্ছে, কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে এবং শ্রমিকের পরিবর্তে চারা কাজে এসকেভেটর ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে, এই অনিয়মের অভিযোগের পর কাজ দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ কাজ বন্ধ রেখে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের বিশেষ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী-খালসহ জলাশয় খননের কাজ চলছে। এরই অংশ হিসেবে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের বাকডোকরা খাল খননের উদ্যোগ উপজেলা প্রশাসন নিয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে শুরু হয়।
বাকডোকরা কুলাডাঙ্গী পুল থেকে পশ্চিমে আব্বাস আলীর জমি পর্যন্ত ৬০৫ মিটার দীর্ঘ খাল খনন, দুটি কালভার্ট নির্মাণ, পাইপ স্থাপন ও বৃক্ষরোপণের জন্য মোট বরাদ্দ ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আটোয়ারী প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, খননে শ্রমিকদের মাধ্যমে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৮০০ টাকা, এসকেভেটর দিয়ে তিন লাখ ৫৬ হাজার টাকা, আরসিসি পাইপ বসাতে ছয় লাখ ৪৭ হাজার টাকা, কালভার্ট নির্মাণে ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮৫০ টাকা, ঘাস লাগানোর জন্য ৭৬ হাজার ৩৮১ টাকা এবং বৃক্ষরোপণের জন্য চার লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের এসব তথ্যে গড়মিল দেখা গেছে। প্রকল্পের বরাদ্দে দুটি কালভার্টের জন্য ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা বরাদ্দ ঝূলা রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত স্থানে কোনো খাল না থাকলেও কাগজে-কলমে সেখানে খাল দেখানো হচ্ছে। যদিও খাল খননে শ্রমিক ব্যবহার করার কথা থাকলেও অধিকাংশ কাজ শুরুতেই এসকেভেটর দিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে। পরে বেশ কিছু সময়ের জন্য শ্রমিক দিয়ে লোক দেখানো খননের কাজ করা হয়।
এদিকে প্রকল্পের শুরুতে একটি কালভার্ট নির্মাণের কথা ছিল, কিন্তু তার বদলে আরেকটি কালভার্ট জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা উপজেলা প্রশাসনে অভিযোগ জানালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী কাজ বন্ধ করে তদন্তের নির্দেশ দেন।
এই বিষয়টি তদন্তে উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফয়সালকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, খাল খনন প্রকল্পের সাত সদস্যের কমিটিতে বিএনপি নেতা ও সমর্থকদের রাখা হয়েছে, কিন্তু তারাও জানেন না কীভাবে কাজ করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এই খাল খননে শুরু থেকেই অনিয়ম চলমান। কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে না। কালভার্টের কার্যক্রম ইটের গুঁড়ো দিয়ে করা হচ্ছে। এভাবে কাজ করানোর কারণে কিছু মানুষের পকেটে টাকা ঢুকলেও সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
অন্য একজন বাসিন্দা কাজল জানান, ‘এখানে কোনো খাল ছিল না। ফলে প্রয়োজন নেই এমন জায়গায় খাল খনন করায় আমাদের ৯০ শতাংশ মানুষের ক্ষতিসাধিত হয়েছে। খননের মাটি আমাদের জমির ওপর ফেলা হচ্ছে।’
কমিটির সদস্য ময়না বেগম বলেন, ‘আমাকে না জানিয়ে কমিটিতে রাখা হয়েছে। কাজ হওয়ার কথা ছিল শ্রমিকদের মাধ্যমে, কিন্তু করা হচ্ছে ভেকু মেশিনের মাধ্যমে। শুনেছি ১১৯ জন শ্রমিকের তালিকা করা হয়েছে, যারা চেয়ারম্যান ও দলীয় লোকজন।’
প্রকল্পের সভাপতি ও আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত ইউপি সদস্য করুনা রানী পাল বলেন, ‘আমার মা অসুস্থ। আমি বগুড়ায় রয়েছি। আমি যেসব জায়গায় প্রয়োজন সাক্ষর দিয়ে এসেছি, বাকি সব কাজ চেয়ারম্যান করছেন। কোথায় কী কাজ হয়েছে, ভালো না মন্দ, আমি কিছুই জানি না।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেছেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী কাজ নিহত হচ্ছিল। কালভার্ট নির্মাণে এক ট্রলি নিম্নমানের ইটের খোয়া আনা হয়েছিল, পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ৪৩ দিনের কাজ শেষ হয়েছে। তারা মজুরি পেয়ে গেছে। তবে তদন্তের কারণে এখন কাজ বন্ধ রয়েছে।’
আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাক্কারুল আলম অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘স্থানীয়দের সাথে পরামর্শ করেই খাল খনন কাজ করা হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী জানান, ‘অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় আমরা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন