প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৪:১১ এম || প্রকাশের তারিখঃ ১৫ই জুলাই, ২০২৬ইং; ০৯:০১ পি.এম
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি: রাজতন্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য কি নতুন আরব বসন্তের বার্তা?
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অবৈধ সামরিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বাস্তবতা যে আমূল বদলে গেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের ধারাবাহিক পাল্টা হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার প্রদর্শন এবং সংঘাতকে আঞ্চলিক মাত্রায় বিস্তৃত করার সক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি রাষ্ট্রকে নতুন হিসাব-নিকাশে বাধ্য করেছে। এখন প্রশ্ন আর শুধু ইরান-ইসরাইল বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রে থাকা মার্কিন এই ঘাঁটিগুলো যতদিন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হবে, ততদিন রাষ্ট্রগুলো এমন আরব বসন্তের ঝুঁকির মুখে থাকবে। এমনকি শুধু সেই ঘাঁটি গুলোই নয়; বরং সেগুলোকে আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে। কারণ যুদ্ধের প্রতিটি নতুন ধাপ মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রশ্নকে আরও জোরালো করছে—কেন তাদের ভূখণ্ড অন্য একটি মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হবে?
ইরান ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তাদের দেশ বিদেশি সামরিক আগ্রাসনের ঘাঁটিতে পরিণত না হয়। এই আহ্বান কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জনমতের ওপর এর প্রভাবও বাড়বে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষোভ আর আগের মতো সীমাবদ্ধ থাকে না; তা দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করে আঞ্চলিক জনমতে রূপ নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় যদি জনগণের একটি অংশ এই ধারণায় পৌঁছে যে, তাদের রাষ্ট্র বিদেশি শক্তির সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে গেছে, তাহলে সেই অসন্তোষ নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নেবে না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।
আরব বসন্তের ইতিহাস দেখিয়েছে, কখন কোন ক্ষোভ বিস্ফোরণে রূপ নেবে, তা অনেক সময় শাসকরাও বুঝে উঠতে পারেন না। অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বঞ্চনা, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং বহিরাগত সামরিক জোট—এই কয়েকটি উপাদান একসঙ্গে মিললে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বর্তমান সংঘাত সেই উপাদানগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যেসব রাষ্ট্রে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তাদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি নিজেদের ভূখণ্ডকে আঞ্চলিক যুদ্ধের সামনের সারিতে রাখবে, নাকি নিজেদের জনগণের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মুসলিম দেশ এবং ইরানের সাথে অংশগ্রহণমূলক ভাবে সম্মিলিতভাবে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ যুদ্ধের আগুন একবার রাষ্ট্রের ভেতরের জনঅসন্তোষের সঙ্গে মিশে গেলে তা শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শাসনব্যবস্থার ভিতও কাঁপিয়ে দিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় তাই এমন আশঙ্কা করা অমূলক নয়—যদি এসব রাষ্ট্র তাদের ভূখণ্ডকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহারের সুযোগ অব্যাহত রাখে, তাহলে নতুন করে একটি আরব বসন্তের মতো আন্দোলনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেটি কখন, কোথায় বা কীভাবে ঘটবে—তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, যখন জনগণের ক্ষোভ, আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং বহিরাগত সামরিক উপস্থিতি একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়, তখন রাজনৈতিক বিস্ফোরণ আর কেবল তাত্ত্বিক আশঙ্কা হয়ে থাকে না; তা বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে এমন আশঙ্কা করা আজকের দিনে অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন
কপিরাইট © ২০২৪-২৫ তালাশ বিডি.কম সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। || Design & Developed By "Talash BD Media Limited"