প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস বা ই-কমার্স, গ্রাহকদের কেনাকাটার অভ্যাসকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, দেশে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ।
সম্প্রতি একটি জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগের প্রতি পাঁচজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে একজনেরও বেশি বর্তমানে অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কেনাকাটা করছেন। এর বিপরীতে, এই তালিকার মধ্যে অন্যতম পিছিয়ে রয়েছে বরিশাল বিভাগ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ‘আইসিটি অ্যাক্সেস অ্যান্ড ইউজ বাই হাউজহোল্ডস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস সার্ভে ২০২৪-২৫’ শীর্ষক একটি জরিপের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, দেশের ১৪.৪ শতাংশ মানুষ পণ্য কিনতে বা সেবা পেতে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করেন। এই দিক থেকে ঢাকায় এ হার ২১.৩ শতাংশ, যা দেশের সর্বাধিক। বরিশাল বিভাগে এই হার সবচেয়ে কম, ৮.৭ শতাংশ।
জরিপ অনুযায়ী, অনলাইনে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে পোশাক, জুতা এবং খেলাধুলার সামগ্রী; মোট অনলাইন কেনাকাটার ৭০.৩ শতাংশিই এই খাতে। এরপর খাদ্য ও মুদি পণ্য (৩৪.৬ শতাংশ), ওষুধ (২১.০ শতাংশ), প্রসাধনী (১৭.৯ শতাংশ), আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী (১০.৯ শতাংশ) এবং আইটি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য (৮.৭ শতাংশ) রয়েছে।
মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে এখনও সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হল ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’। অনলাইন ক্রেতাদের ৮৬.৮ শতাংশ পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করেন। অন্যদিকে ১৩.৯ শতাংশ বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করেন। ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন ৩.১ শতাংশ এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে মাত্র ১.১ শতাংশ।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন সংযোগ ১৮ কোটি ৬০ লাখ এবং ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ১২ কোটি ৯৬ লাখে পৌঁছেছে।
জরিপের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বেশি। পুরুষদের মধ্যে ১৭.৫ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করেন, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ১১.৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকার মানুষের তুলনায় শহরের বাসিন্দারা অনলাইন কেনাকাটায় প্রায় দ্বিগুণ এগিয়ে রয়েছেন। শহরের ২০ শতাংশ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করেন, কিন্তু গ্রামে এই হার ১১.৮ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ১৬.২ শতাংশ, খুলনায় ১৪.২ শতাংশ, রাজশাহীতে ১১.৭ শতাংশ, সিলেটে ১০.৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৯.৩ শতাংশ এবং রংপুরে ৯.২ শতাংশ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করেন।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫-৩৪ বছর বয়সী জনগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা রয়েছে। তাদের মধ্যে এ হার ২৪.৭ শতাংশ। ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার ১৯.৪ শতাংশ। তবে ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার হার সবচেয়ে কম, যা ২.৬ শতাংশ।
শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ৪১.৪ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করেন। মাধ্যমিক পাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে এই হার ১৯.৫ শতাংশ, প্রাথমিক মেধাসম্পন্নদের মধ্যে ৮.৩ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীনদের মধ্যে ৩.৭ শতাংশ।
পেশাভিত্তিক হিসাব করলে, বেকারদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার হার সবচেয়ে বেশি, ২৩.৯ শতাংশ। কর্মজীবীদের মধ্যে এই হার ১৮.৯ শতাংশ এবং কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ১০.৫ শতাংশ।
জরিপে আরও জানা গেছে, অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে ১১.৪ শতাংশ ক্রেতা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ১১.৪ ও ১১.৫ শতাংশ; যা প্রায় সমান।
গ্রামের ক্রেতাদের ১১.৬ শতাংশ এবং শহরের ১১.৩ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটায় ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছেন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগের ক্রেতারা। উভয় বিভাগেই এ হার ১৭.২ শতাংশ। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের ক্রেতারা সবচেয়ে কম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, যেখানে হার মাত্র ৬.৮ শতাংশ।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। এ হার ১৬.৬ শতাংশ। ৩৫-৪৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১২.৩ শতাংশ, ৪৫-৫৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১২.১ শতাংশ এবং ১৫-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১০.৯ শতাংশ ক্রেতা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, এই তথ্যগুলো দেখা গেছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে, প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা ক্রেতাদের মধ্যে সমস্যার হার সবচেয়ে বেশি, ১৫.৫ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীনদের মধ্যে এ হার ৮.৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ১০.৮ শতাংশ।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বেশি কাটতি পোশাক, জুতা এবং খেলাধুলার সামগ্রীর, যার গড় হার ৭০.৩ শতাংশ। তবে পণ্যভিত্তিক পছন্দে নারী ও পুরুষদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা গেছে। নারীদের ক্ষেত্রে এই ক্যাটাগরির পণ্য কেনার হার যেখানে ৭৫.৩ শতাংশ, পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৬৬.৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, অনলাইনে খাদ্য ও মুদি পণ্য কেনাকাটায় পুরুষদের হার ৩৬.৩ শতাংশ এবং নারীদের ৩২.২ শতাংশ। ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও পুরুষদের সংখ্যা বেশি। এখানে পুরুষদের হার ২৪.৩ শতাংশ, নারীদের ১৬.২ শতাংশ।
অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল ‘অর্ডার অনুযায়ী সঠিক পণ্য না পাওয়া’। ভোগান্তির শিকার ক্রেতাদের ৫০.৭ শতাংশ এ অভিযোগ করেছেন। পুরুষদের মধ্যে এই হার ৪৯.৩ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৫২.৬ শতাংশ।
দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা হলো ‘পণ্যের নিম্নমান’। এ অভিযোগ করেছেন ৪৪.৮ শতাংশ ক্রেতা। পুরুষদের মধ্যে এই হার ৪৪.৭ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ। এছাড়া ১৯.৩ শতাংশ ক্রেতা সময়মতো পণ্য হাতে না পাওয়ার বা ‘দেরিতে ডেলিভারি’র অভিযোগ করেছেন। পুরুষদের মধ্যে এই হার ২০.৩ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ১৭.৮ শতাংশ। অন্যদিকে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ৯.৭ শতাংশ ক্রেতা।
পণ্যের মান নিয়ে শহরের ক্রেতাদের অসন্তুষ্টি বেশি। শহরের ৪৮ শতাংশ ক্রেতা নিম্নমানের পণ্যের অভিযোগ করেছেন, যেখানে গ্রামে এ হার ৪০.৭ শতাংশ। তবে ভুল পণ্য বা অর্ডার অনুযায়ী ভিন্ন সামগ্রী পাওয়ার ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের চিত্র প্রায় একই। শহরের ৫০.৬ শতাংশ এবং গ্রামের ৫০.৭ শতাংশ ক্রেতা এই ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।
পণ্য হাতে পাওয়ার বা ডেলিভারি পদ্ধতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সর্বাধিক ৫৫.৬ শতাংশ ক্রেতা নির্দিষ্ট কালেকশন পয়েন্ট বা পোস্ট অফিস থেকে তাদের পণ্য সংগ্রহ করেছেন। অন্যদিকে, কুরিয়ার বা পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি ‘হোম ডেলিভারি’ বা ঘরে বসে পণ্য পেয়েছেন ৩০.৬ শতাংশ গ্রাহক।
এদিকে দেশের একটি বিশাল অংশ এখনও কেন অনলাইন কেনাকাটার বাইরে রয়েছেন। এর কারণও এই জরিপে উঠে এসেছে। অনলাইনে কেনাকাটা না করা ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই (৭৫.৮ শতাংশ) সরাসরি দোকানে গিয়ে পণ্য দেখে বা যাচাই করে কিনতে চায়।
এছাড়া ৩৫.৮ শতাংশ মূলে জানান যে, তাদের অনলাইনে কেনাকাটার প্রয়োজন নেই। পরবর্তী ১২ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা বা জ্ঞানের অভাব রয়েছে। আর ৩.৩ শতাংশ ব্যক্তি গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জরিপের ফলাফল নির্দেশ করে, দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য দ্রুত সম্প্রসারণের পথে রয়েছে। একই সাথে, অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিকাশমান ভোক্তা অর্থনীতির সম্ভাবনা এবং বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোরও একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছে এই জরিপ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন