প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী ও টেকসই করার জন্য জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের যে কোন ধরনের অস্থিরতার মধ্যে দেশের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিমুক্ত করা উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুসারে, এই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তেলের মজুত সক্ষমতা ৬০ দিন থেকে বাড়িয়ে ৭১ দিন করা হবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তারপর তা ৯০ দিনে উন্নীত করা হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জ্বালানি খাতের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন ডিপো নির্মাণ, অব্যবহৃত ট্যাংক সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত ট্যাংক ভাড়াসহ বিভিন্ন প্রকল্প কার্যকর করে চলেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ৬০ দিনের বেশি জ্বালানি তেল মজুতের সক্ষমতা বিদ্যমান। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তা ৭১ দিনে উন্নীত করা সম্ভব হবে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে ৯০ দিনের মজুত নিশ্চিত করতে আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছি।’
জ্বালানি বিভাগ জানায়, জাতীয় জ্বালানি নীতি-১৯৯৬ অনুযায়ী, দেশে ৬০ দিনের কৌশলগত জ্বালানি তেল মজুত করার বিধান আছে। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত থাকায় কোনো সংকট প্রকটিত হয়নি।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ‘জ্বালানি নীতিতে ৬০ দিনের কৌশলগত মজুতের কথা বলা হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় আমরা ধাপে ধাপে এটি ৯০ দিনে উন্নীত করবো। এই বিষয়ে কাজ চলছে। তবে বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই।’
বার্ষিক চাহিদা ও বর্তমান সক্ষমতা:
জ্বালানি বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) জন্য দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার টন, যা মাসিক গড় ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৫০ টন। এছাড়া ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন, জেট ফুয়েলের চাহিদা ৬ লাখ ৬৩ হাজার টন, অকটেনের ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯০০ টন এবং পেট্রোলের চাহিদা ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টন।
বর্তমানে বিপিসি’র আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ ছয়টি কোম্পানির মোট জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা ১৫ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬ টন। এর মধ্যে ৬৭ হাজার ৬৩২ টন ধারণক্ষমতার অবকাঠামো সংস্কার ও মেরামতের কাজ চলছে। বর্তমানে বিপিসি’র নিজস্ব সক্ষমতায় ডিজেল ৫৭ দিন, অকটেন ৪৬ দিন, পেট্রোল ২৯ দিন এবং ফার্নেস অয়েল ৭৮ দিনের মজুত রয়েছে। এই সক্ষমতা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ট্যাংক ব্যবহারে:
জ্বালানি বিভাগ জানায়, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) সহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ১ লাখ ৪২ হাজার ২৯৮ টন ডিজেল এবং ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪০০ টন ফার্নেস অয়েল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে।
সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ট্যাংক ভাড়ায় ব্যবহার করতে চায়। এছাড়া বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮২ হাজার ২০০ টন ধারণক্ষমতার মজুদাগার সংস্কার করে পরিচালনায় আনা হবে।
জ্বালানি সচিব বলেন, ‘সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের ট্যাংক ভাড়ার বিষয়ে আলোচনা যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলওয়ে এবং বিআরটিসি রয়েছে। এসব বিকল্প সুযোগ মাথায় রেখে নিজস্ব অবকাঠামো বাড়াতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ডিজেলের ক্ষেত্রে বিপিসি’র বর্তমান কৌশলগত মজুত সক্ষমতা ৫৭ দিনের। তবে বিদ্যুৎ ও রেলওয়ের মতো বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ৩ মাসের তেল কিনে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় মজুত রাখে, সেক্ষেত্রে কোনো নতুন প্রকল্প ছাড়া দেশের সামগ্রিক জ্বালানি মজুত আরও ১২ থেকে ১৩ দিন বৃদ্ধি পাবে।’
মজুত বৃদ্ধিতে আসছে যেসব কর্মসূচি:
বিপিসি জানায়, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের আওতায় গত জুনে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোর কমিশনিং সম্পন্ন হয়েছে। নতুন ট্যাংক চালু হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের মজুত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৩৭ টন বেড়েছে। ফলে বিপিসি’র মোট মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৫০৩ টন হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে পার্বতীপুরে আরও চারটি নতুন ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়াও কুমিল্লায় বিদ্যমান অটোমেটেড ডিপো এলাকায় নিজস্ব অর্থায়নে আরও ছয়টি ডিপো নির্মাণ করা হবে। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা পেট্রোলিয়ামের গোদনাইল ডিপোতে ১১ হাজার টন ধারণক্ষমতার দুটি নতুন ট্যাংক এবং ফতুল্লার আলীগঞ্জ ডিপোতে ১৩ হাজার টন ধারণক্ষমতার আরও দুটি ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে গোদনাইলে ১ হাজার ৪৫০ টন ধারণক্ষমতার একটি এইচওবিসি ট্যাংক নির্মাণাধীন রয়েছে।
বিপিসি জানায়, এর পাশাপাশি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির প্রধান স্থাপনাগুলোর খালি জায়গায় নতুন ডিপো ও ট্যাংক নির্মাণ প্রকল্প বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা অয়েলের ৯ হাজার ৫০০ টনের দুটি ট্যাংক, মেঘনা অয়েলের ১০ হাজার টনের তিনটি ট্যাংক এবং যমুনা অয়েলের সাড়ে ৫৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার নতুন ট্যাংক রয়েছে।
সিলেটের পদ্মা অয়েল ডিপোর ১ হাজার ৩৭ টন ধারণক্ষমতার তিনটি জেট ফুয়েল ট্যাংক ডিজেল সংরক্ষণের উপযোগী করা হচ্ছে। ভৈরব বাজার ডিপোতে ২ হাজার ১৬৫ টনের পাঁচটি ট্যাংক নির্মাণকাজ চলছে। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওমেরার ৪০ হাজার টন ধারণক্ষমতার ট্যাংকের মধ্যে ৩০ হাজার টন ভাড়ায় নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে বিপিসি।
বিপিসি’র চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত জুনে পার্বতীপুর ডিপোর কমিশনিং সম্পন্ন হওয়ায় মজুত সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার টন বেড়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পার্বতীপুরে আরও চারটি এবং কুমিল্লায় ছয়টি ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানির খালি জায়গায় নতুন ডিপো ও ট্যাংক নির্মাণ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি কেরোসিন ও জেট ফুয়েলের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে উদ্বৃত্ত ট্যাংকগুলো ডিজেল সংরক্ষণের উপযোগী করা হচ্ছে। এর সাথে সাথে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্যাংক ভাড়ায় নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।’
আরও পড়ুন
জুলাইয়ের ১৪ দিনে দেশে ১৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নতুন জমি অধিগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে অচল ট্যাংক সচল করা, কেরোসিনের ট্যাংক ডিজেলে রূপান্তর সহ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রেলওয়ের অব্যবহৃত ট্যাংক ব্যবহার করা হলে দ্রুত মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তাদের মতে, এটি সরকারের একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
সূত্র: বাসস
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন