প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে লেবাননের নারী ও শিশুদের জিম্মি করে বন্দিশিবিরে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির।
হিজবুল্লাহর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের মধ্যে চলতি সপ্তাহে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি এ প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, 'হিজবুল্লাহকে মোকাবিলায় নতুনভাবে ভাবতে হবে। শুধু এলাকা দখল করা বা যোদ্ধা হত্যা নয়, তাদের নারী ও তরুণদের আটক করে কারাগারে নেওয়া উচিত। এতে তাদের সবচেয়ে বেশি আঘাত লাগবে।'
বেন গভিরের এই প্রস্তাবে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা উসকে দিয়েছে। তার এই মন্তব্যকে অনেকেই লেবাননের সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত শাস্তির আহ্বান হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সাধারণ বেসামরিক মানুষকে আটক বা লক্ষ্যবস্তু করা বৈধ নয়।
বেন-গভির অনেক আগে থেকেই এক বিতর্কিত ব্যক্তি। তিনি অতীতেও ফিলিস্তিনি ও লেবানিজদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি করেছেন। তিনি নিষিদ্ধ কাচ আন্দোলনের অনুসারী এবং একসময় ১৯৯৪ সালে হেবরনে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসল্লিকে হত্যা করা ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বারুচ গোল্ডস্টেইনের ছবি নিজের বাসায় টাঙিয়ে রেখেছিলেন।
মার্চ মাসে লেবাননে ইসরাইলের নতুন সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী কয়েকজন লেবানিজ বেসামরিক নাগরিককে অপহরণ বা আটক করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও বর্তমানে ইসরাইলের 'অবৈধ যোদ্ধা আইন' অনুযায়ী ১,৩১৬ জন আটক রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন হামোকেদ।
বিতর্কিত আইনটি ২০০২ সালে চালু হয়। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের না করেও দীর্ঘ সময় আটক রাখা যায়। আইনটি মূলত গাজার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, লেবানন ও সিরিয়ার নাগরিকদের বিরুদ্ধেও এটি প্রয়োগ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই আইন ইচ্ছামতো ও বাইরের যোগাযোগবিহীন আটক রাখার সুযোগ দেয়। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, গোপন প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়ার যথাযথ সুযোগ ছাড়াই মানুষকে আটক রাখার সুযোগ তৈরি করে এই আইন।
বেন-গভিরের এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে যখন ইসরাইলের মন্ত্রীরা লেবাননে সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও ইসরাইল লেবাননে বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে। লেবাননের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিশেল মেনাসা জানিয়েছেন, ১৭ এপ্রিল থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি বিমান হামলা, ৪০৭টি নিয়ন্ত্রিত ধ্বংস অভিযান এবং ৬টি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান চালিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা লেবাননে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করবেন। তারা সংঘাতের সব পক্ষের সম্ভাব্য আইনভঙ্গের ঘটনা পর্যালোচনা করবেন এবং ভবিষ্যৎ প্রতিবেদনের জন্য তথ্য সংগ্রহ করবেন।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, লেবাননে ইসরাইলের যুদ্ধের ফলে ৩ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ লক্ষের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
মানবিক পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহেরও কম সময়ে দক্ষিণ লেবাননের তিনটি হাসপাতাল ইসরাইলি হামলার শিকার হয়েছে। এতে ৯ জন নিহত এবং ১৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই স্বাস্থ্যকর্মী।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এতে বাস্তুচ্যুত ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার দক্ষিণ লেবাননের টায়ার শহরে ইসরাইলি হামলায় ৮ জন নিহত এবং অন্তত ৩২ জন আহত হন। একই সঙ্গে ইসরাইলের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশের কারণে শহরের ঐতিহাসিক খ্রিস্টান অধ্যুষিত এলাকা থেকে শত শত মানুষ পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
টায়ারের খ্রিস্টান নেতারা জরুরি আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের সতর্কবার্তা হলো, এই এলাকায় হামলা অব্যাহত থাকলে তা মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও বড় ক্ষতি ডেকে আনবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন