প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০১:৪২ এম || প্রকাশের তারিখঃ ২০ই আগস্ট, ২০২৬ইং; ০৪:৪৬ পি.এম
যুদ্ধের ক্ষতি বোঝাতে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই আঘাত হানবে?
দূরদেশে যুদ্ধ করার আমেরিকান অভ্যাস ভাঙতে পারলেই বদলে যেতে পারে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র। আমেরিকা বহু দশক ধরে এমন এক যুদ্ধনীতিতে অভ্যস্ত—যুদ্ধ হবে অন্যের ভূখণ্ডে, মরবে অন্য দেশের মানুষ, ধ্বংস হবে অন্য দেশের শহর; কিন্তু আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থাকবে নিরাপদ।
ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অভিঘাত পৌঁছে যাবে বাগদাদ, কাবুল, তেহরান, ত্রিপোলি কিংবা অন্য কোনো রাজধানীতে—কিন্তু সেই যুদ্ধের ধোঁয়া, আতঙ্ক ও ধ্বংস সাধারণ আমেরিকান নাগরিকের ঘরের দরজায় কড়া নাড়বে না।এই যুদ্ধনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। যে জনগণ যুদ্ধের মূল্য নিজের চোখে দেখে না, সেই জনগণের কাছে যুদ্ধ অনেক সময় একটি টেলিভিশন-চিত্র মাত্র।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংঘাত তাই কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বনাম ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ নয়। এটি আরও বড় একটি প্রশ্নের যুদ্ধ—যুদ্ধের মূল্য কে দেবে?
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা, পরবর্তী পাল্টা আঘাত, জুনের সমঝোতা এবং তার ভেঙে পড়ার পর সংঘাত আবার ভয়ংকর মোড় নিয়েছে। ১৭ আগস্ট ৬০ দিনের সমঝোতার সময়সীমা শেষ হয়েছে; ওয়াশিংটন ও তেহরান পরস্পরকে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করছে। ইরান এখন আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে এবং হরমুজকে কেন্দ্র করে সংঘাতের চাপ বাড়ছে। এখানে ইরানের সামনে সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রশ্নটি হলো—কীভাবে এমন প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, যাতে আমেরিকা বুঝতে পারে যুদ্ধ কেবল অন্যের ঘরে আগুন লাগানোর নাম নয়।
আমেরিকার নিরাপদ দূরত্বের যুদ্ধঃ
ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তির একটি অনন্য সুবিধা হলো দূরত্ব। বিশ্বের এক প্রান্তে বসে মার্কিন বাহিনী অন্য প্রান্তে অভিযান চালাতে পারে। বিমানবাহী রণতরী যায়, বোমারু বিমান যায়, ক্ষেপণাস্ত্র যায়—কিন্তু আমেরিকার শহরগুলোতে যুদ্ধের বাস্তবতা পৌঁছায় না।
এই দূরত্বই রাজনৈতিক সুবিধা। কারণ একজন আমেরিকান নাগরিক যদি প্রতিদিন নিজের শহরের আকাশে যুদ্ধবিমান না দেখে, বিস্ফোরণের শব্দ না শোনে, পরিবারকে নিরাপদে রাখার জন্য রাত জাগতে না হয়—তাহলে বিদেশের যুদ্ধ তার কাছে অনেক দূরের একটি ঘটনা হয়ে থাকতে পারে।
ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য তাই ওয়াশিংটন দখল করা নয়। সাফল্য হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানার সক্ষমতা প্রমাণ করেই সেই নিরাপদ দূরত্বের ধারণাটিকে ভেঙে দেওয়া। অর্থাৎ এমন প্রতিরোধক্ষমতা দেখানো, যাতে আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা আর নিশ্চিত থাকতে না পারেন যে যুদ্ধের সব ক্ষতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই আটকে থাকবে।এটি সামরিকের চেয়েও বড় একটি রাজনৈতিক বার্তা।
এখানেই ‘আমেরিকার মাটিতে পৌঁছানোর সক্ষমতা’ গুরুত্বপূর্ণ যে, ইরানের গোপন ICBM আছে কি না, অথবা গোপন কোনো পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুত আছে কি না—এসব নিয়ে নানা দাবি, জল্পনা ও প্রচার রয়েছে। তবে ইতিমধ্যেই ইরান আই সি বি এম এবং পরমাণু অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেছে এমনটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের উপর পারমাণবিক হামলার সম্ভাব্য খবর প্রকাশের পর ইরানের পক্ষ থেকেও তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ সমানে সমান প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার অর্থ দাঁড়ায় ইরানের হাতেও রয়েছে এবং সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পৌঁছতে পারে এমন আইসিবিএম হয়তো তাদের কাছে রয়েছে।
কিন্তু প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ইরানের কার্যকর ICBM সক্ষমতা এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। মার্চে বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নেও বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছানোর মতো কার্যকর ইরানি ICBM তখনও বাস্তব সক্ষমতা হিসেবে দেখা যাচ্ছিল না।
কিন্তু রাজনীতির ভাষায় কখনও কখনও সক্ষমতার চেয়ে সক্ষমতার অনিশ্চয়তাও শক্তিশালী অস্ত্র। যদি ওয়াশিংটন নিশ্চিত না থাকে যে ইরানের হাতে কত দূরপাল্লার সক্ষমতা আছে, কোথায় তা লুকানো, কতটা পুনর্গঠন করা হয়েছে—তাহলে আমেরিকার যুদ্ধ পরিকল্পনা কারীদের হিসাবও বদলে যায়।
এটাই প্রতিরোধের মনস্তত্ত্ব।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: পারমাণবিক হামলা কোনো ‘বিজয়ের সহজ রাস্তা’ নয়। সেটি মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এবং যুদ্ধকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে যেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই ইরানের প্রকৃত কৌশলগত সাফল্য হবে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা যাতে আমেরিকা জানে—ইরানকে আঘাত করার মূল্য আগের মতো একতরফা নয়।
তেহরানের হাতে ইতিমধ্যেই একটি ভয়ংকর কার্ড আছে,সেটি হলো হরমুজ।বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। ইরান হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে; যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
এখানে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে—একটি দেশের ভূগোলও কখনও কখনও বিমানবাহী রণতরীর চেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
আমেরিকা যদি তেহরানকে তার ভূখণ্ডে আঘাত করে দুর্বল করতে চায়, ইরান পাল্টা এমন চাপ তৈরি করতে চাইছে যার অভিঘাত ওয়াশিংটনের বাইরেও পৌঁছায়—জ্বালানি বাজারে, নৌপথে, মিত্রদের অর্থনীতিতে এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায়।এটি হলো অসম যুদ্ধের পাল্টা গণিত।
‘সিংহ’ হওয়ার অর্থ কী?
ইরানকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের সিংহ’ বলা হয় তার ভূগোল, ইতিহাস, সভ্যতা, জনসংখ্যা ও সামরিক ঐতিহ্যের কারণে। কিন্তু আধুনিক যুগে সিংহ হওয়ার অর্থ শুধু বড় ক্ষেপণাস্ত্র থাকা নয়।সিংহ হওয়ার অর্থ হলো—যে শক্তি তোমার ঘরে ঢুকতে পারে, তাকে বোঝানো যে তোমার ঘরও সম্পূর্ণ অরক্ষিত নয়।
এখানে ‘আমেরিকার মাটিতে আঘাত’ একটি প্রতীকী ধারণা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। যেদিন আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বুঝবেন যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁরা নিশ্চিন্তে ওয়াশিংটনে বসে থাকতে পারবেন না, সেদিন যুদ্ধের রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞান বদলে যাবে।
যেদিন একজন সাধারণ আমেরিকান নাগরিক বিদেশের যুদ্ধকে শুধু CNN-এর পর্দায় নয়, নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির প্রশ্ন হিসেবে দেখতে শুরু করবেন, সেদিন বিদেশে যুদ্ধ করার জন্য রাজনৈতিক সমর্থনও আগের মতো সহজ থাকবে না।
এই জায়গাটিই ইরানের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমেরিকান নাগরিককে হত্যা করা নয়—আমেরিকান রাষ্ট্রকে যুদ্ধের মূল্য বোঝানো।
কারণ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—দূরত্বের সুবিধা চিরস্থায়ী নয়।
ওয়াশিংটন বহু বছর ধরে এমন একটি সমীকরণে অভ্যস্ত ছিল:আমেরিকা আঘাত করবে → প্রতিপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে → আমেরিকার ভূখণ্ড নিরাপদ থাকবে। ইরানের পাল্টা প্রতিরোধ যদি এই সমীকরণ বদলে দিতে পারে, তাহলে সেটিই হবে বড় ঘটনা।
নতুন সমীকরণ হতে পারে: আমেরিকা আঘাত করবে → ইরান পাল্টা প্রতিরোধ গড়বে → আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে → যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য আমেরিকাকেও দিতে হবে।
এই পরিবর্তন ঘটাতে পারলে ইরান হয়তো আমেরিকার চেয়ে সামরিকভাবে শক্তিশালী হবে না; কিন্তু যুদ্ধের কৌশলগত হিসাব বদলে দিতে পারবে।আর যুদ্ধের ইতিহাসে অনেক সময় এটাই বিজয়।
তবে শেষ কথা হলো, ইরান যদি সত্যিই এই যুদ্ধে ইতিহাস বদলাতে চায়, তাহলে তাকে শুধু আরও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেই হবে না। তাকে এমন প্রতিরোধক্ষমতা দেখাতে হবে, যাতে পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিক ভাবে শক্তিশালী কয়েক দশকের আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রটিও বুঝতে বাধ্য হয়—অন্যের ভূখণ্ডে যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু যুদ্ধের পরিণতি নিজের ভূখণ্ড থেকে চিরকাল দূরে রাখা সম্ভব নয়।
ইরানের সবচেয়ে বড় বিজয় হবে না কোনো শহর ধ্বংস করা। সবচেয়ে বড় বিজয় হবে সেই মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে দেওয়া, যে দেয়ালের ওপারে দাঁড়িয়ে আমেরিকা এতদিন পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর যুদ্ধ, ধ্বংস ও কান্না দেখেছে—কিন্তু নিজের জনগণকে তার পূর্ণ মূল্য দিতে হয়নি। সুতরাং ‘আমেরিকার মাটিতে আঘাত’ কথাটিকে যদি আমরা একটি কৌশলগত প্রতীকে পরিণত করি, তার অর্থ দাঁড়ায়:
যে শক্তি দূরদেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে পারে, তাকে বোঝানো—দূরত্ব কোনো চিরস্থায়ী ঢাল নয়।
ইরান সেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারলে, হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যই শুধু বদলাবে না—বদলে যেতে পারে বিশ্বরাজনীতির যুদ্ধের ভাষা। তখন ইতিহাস হয়তো বলবে— ইরান আমেরিকা কে পরাজিত করেনি; ইরান আমেরিকাকে প্রথমবারের মতো বুঝিয়েছিল—যুদ্ধেরও মূল্য আছে। আর সেই মুহূর্ত থেকেই হয়তো মানচিত্রের চেয়েও বড় কিছু বদলাবে—বিশ্বশক্তির অহংকারের মানচিত্র।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন
কপিরাইট © ২০২৪-২৫ তালাশ বিডি.কম সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। || Design & Developed By "Talash BD Media Limited"