প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
স্পেনের বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় সরকারের ভূমিকার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।
বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে যে, সানচেজ সরকার সেউতার বাসিন্দাদের সংকটের মধ্যে ফেলে রেখেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো অভিবাসী সংকটকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। গত ৩০ ও ৩১ জুলাই মরক্কো থেকে অন্তত ৭২ হাজার অভিবাসী সেউতায় প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগকেই পরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এখনো প্রায় ৫ হাজার মানুষ অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছেন। অনেকে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও সমুদ্রসৈকতে অবস্থান করছে। এই পরিস্থিতিতে সেউতায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে এটি সানচেজ সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছেন। তাদের দাবি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। পাশাপাশি স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের পুনর্বণ্টনের দাবিও উঠেছে। বুধবার স্পেনের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। এসব শহরের অনেকটিতে বিরোধী রক্ষণশীল দল পিপি এবং কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টি সরকার পরিচালনা করছে অথবা দল দুটির উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে।
রাজধানী মাদ্রিদেও বড় একটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেখানে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন। বিক্ষোভে পিপির নেতা আলবের্তো নুনিয়েস ফেইহো অংশ নেন। ফেইহো অভিযোগ করেন, সেউতাকে কার্যত দখল ও অবরুদ্ধ অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে এবং স্পেন সরকার বিষয়টি আগে থেকেই জানত। ভক্স পার্টির নেতা সান্তিয়াগো আবাসকালও সানচেজ সরকারের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, সানচেজ মরক্কো সরকারের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন। সেউতায়ও বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা ‘সেউতা বিক্রির জন্য নয়, সেউতাকে রক্ষা করতে হবে’—এমন স্লোগান দেন।
সেউতার ৪৫ বছর বয়সী শিক্ষক ডেভিড হার্নান্দেজ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট ছিল না এবং তা অনেক দেরিতে এসেছে। তার মতে, সরকার পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেনি। তিনি বলেন, সেউতার বাসিন্দারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নন এবং তাদের সীমান্তের বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না। বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সীমান্ত পার হওয়ার ঘটনায় মরক্কোর সীমান্তরক্ষীদের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বুধবার পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী ‘সম্পূর্ণ উদাসীনতা’ দেখিয়েছিল। স্পেনের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সানচেজ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরো বেড়েছে।
জাতীয় পুলিশ বাহিনীর জাতীয় অভিবাসন ও সীমান্ত কেন্দ্রের পক্ষ থেকে স্পেনের জাতীয় আদালতে ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেউতার সীমান্তের কাছে মরক্কোর পুলিশের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় স্পষ্টভাবে কম ছিল। সীমান্ত পার হওয়া অভিবাসীদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের অনেকেই বলেছেন, সীমান্ত পার হওয়ার সময় মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী কার্যকর কোনো বাধা দেয়নি এবং তাদের আচরণ ছিল নিষ্ক্রিয়। তবে পুলিশের প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়নি যে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে সেউতায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার পেছনে মরক্কো সরকার বা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীই ছিল।
এর কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জোর দিয়ে বলেছিলেন, সেউতায় অভিবাসীদের প্রবেশের ঘটনায় মরক্কোকে দায়ী করা ঠিক হবে না। সানচেজের মতে, মানবপাচারকারী চক্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমান্ত পার হওয়ার জন্য উৎসাহিত হয়েছেন। তবে মরক্কোও এ ঘটনায় নিজেদের কোনো ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির দাবি, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সীমান্ত পার হওয়ার ঘটনা তারা আয়োজন করেনি এবং এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেউতায় অভিবাসীদের ঢলের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমান্ত পার হওয়া নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে স্পেনের তথ্য যাচাইকারী ওয়েবসাইট মালদিতা।
ওয়েবসাইটটির তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সেউতায় প্রবেশের ঘটনা শুরুর আগেই মরক্কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। এসব বার্তায় মরক্কো ও সেউতার মধ্যকার সীমান্তের বেড়াকে নিরাপদ এবং সহজে পার হওয়া সম্ভব বলে দেখানো হয়েছিল। জুনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পর এসব বার্তা আরও ছড়িয়ে পড়ে বলে জানানো হয়েছে। সেউতার মেয়রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের বেড়া এড়িয়ে সাঁতরে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১০০ জন মারা গেছেন। এদিকে সেউতা ও পাশের আরেক স্প্যানিশ স্বায়ত্তশাসিত শহর মেলিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে মরক্কো।
এই দুই শহরকে ঘিরে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক টানাপড়েন বিদ্যমান। ফলে সেউতায় সাম্প্রতিক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে সেউতায় কয়েক হাজার অভিবাসী অবস্থান করছেন। তাদের একটি অংশ অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে থাকলেও অনেকে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপ, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে সানচেজ সরকার।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন