প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গত ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সাগরে মাছ শিকারের জন্য সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। দীর্ঘ বিরতিতে মাছের নিরাপদ প্রজনন সম্পন্ন হতে গেলে, সাগরে ইলিশের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং জালে প্রচুর মাছ পাওয়া যাবে- এই আশায় দলে দলে জেলেরা সাগরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।
তবে নিষেধাজ্ঞার পর আট দিন গেলেও কাঙ্খিত ইলিশের দেখা মেলেনি। ফলে হতাশা নিয়ে প্রায় খালি হাতে ফিরে যেতে দেখা গেছে অধিকাংশ জেলে নৌকাকে।
জেলেরা জানান, গভীর সাগরে মাছ ধরতে গেলে একটি বড় ট্রলারের প্রয়োজন হয়, যেখানে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন থাকতে হয়। প্রত্যেক ট্রলারে ১৫ থেকে ২৫ জন মাঝি-মাল্লা রয়েছেন। এই সময়ে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, বরফ, জ্বালানি তেল ও অন্যান্য রসদের জন্য খরচ হয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। একটি লাভজনক ট্রিপ বাস্তবায়নের জন্য অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি প্রয়োজন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতিতে অনেক ট্রলার খরচের অর্থও তুলতে পারেনি।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটে দেখা যাচ্ছে, সেখানে ট্রলার ভিড় করে থাকলেও চিরচেনা কোলাহল অনুসন্ধান করা খুবই কঠিন। মাছ নামানোর ব্যস্ততা, আড়তদারদের হাঁকডাক কিংবা শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই অনুপস্থিত। কারণ, অধিকাংশ ট্রলারই ঘাটে ফিরে এসেছে হতাশা নিয়ে, ট্রলারভর্তি ইলিশের অভাবে।
উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে ও ট্রলার মালিকদের দাবি, সাগরে মাছের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে, এটি শুধু তাদের জীবিকাই নয়, দেশের মাছভিত্তিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় হুমকির সৃষ্টি করবে। এজন্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তারা দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, পাথরঘাটা খুচরা মাছ বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাছের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক ধরনের মাছের প্রত্যাশিত দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মালিক মো. আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর বড় আশা নিয়ে সাগরে গিয়েছিলাম। কিন্তু পাঁচ থেকে সাত দিন সাগরে থেকেও কাঙ্খিত মাছ পাইনি। বাধ্য হয়ে খালি হাতেই ফিরে আসছি। যে ট্রিপে আগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতাম, এবার সেখানে খরচের টাকাও ওঠেনি।’
এই ট্রলারের মালিক আরো বলেন, ‘যখন আমরা এক ট্রিপে ১০-১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করি, তখন সবাই তা শুনতে পায়। কিন্তু টানা তিন-চারটি ট্রিপ লোকসান হলে সেই কষ্টের কথা কেউ শোনে না। আমি ভেবেছিলাম আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব। কিন্তু উল্টো আরো লোকসানের মুখে পড়ছি। এভাবে চলতে থাকলে একসময় হয়তো এই পেশা ছাড়তে হবে।’
এফবি সিফাত ট্রলারের মালিক মো. মুজিবুর রহমান কালু মন্তব্য করেছেন, ‘মাছ না পাওয়ায় জেলেদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অনেকেই দাদন ও ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা।’ তিনি জানান, গোপন সূত্রে তার কাছে খবর এসেছে যে নিষেধাজ্ঞাকালে কিছু অসাধু ট্রলার মালিক ও জেলে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে সাগরে মাছ শিকার করেছেন।
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনে জেলেরা কর্মহীন সময় কাটিয়েছেন। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আশা ছিল নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গিয়ে ভালো মাছ পাবেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখন ইলিশের ভরা মৌসুম, অথচ সাগরে মাছের দেখা মিলছে না।’
পাথরঘাটা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাসিবুল হক মন্তব্য করেছেন, ‘জেলেরা প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম মাছ পাচ্ছেন বলে জানতে পেরেছি। আমরা ভেবেছিলাম, নিষেধাজ্ঞার পর মাছের প্রাচুর্য বাড়বে। তবে এটি সাময়িক পরিস্থিতি হতে পারে। আশা করছি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সাগরে ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের উপস্থিতি বাড়বে এবং জেলেরা ভালো আহরণ করতে পারবেন।’
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন