প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একজন নিপাট গৃহবধূ হিসেবে খালেদা খানম এসেছিলেন স্বামী জিয়াউর রহমানের পরিবারে। ঘর-সংসার সামলানোর চৌহদ্দিতে আবদ্ধ থাকা একজন বাঙালি নারীর জীবন পরিবর্তনের নানা বাঁক পেরিয়ে এগিয়ে চলেছিল। সংসারজীবন থেকে বেরিয়ে বেগম জিয়া গণতন্ত্রের মহাযাত্রায় নাম লেখান। তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের বাতিঘর।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির পথে যাত্রা শুরু করা এই দীর্ঘ অধ্যায়টি সহজ ছিল না। শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শকে পাথেয় করে মা, মাটি ও মানুষের রাজনীতি করার সংগ্রামে অদম্য ও অবিচল থাকার জন্য বেগম খালেদা জিয়া পেয়েছিলেন ‘আপোসহীন নেত্রী’র উপাধি।
প্রিয়তম স্বামীর মৃত্যুতে বেগম জিয়ার পরিবারে নেমে আসে ঘন কালো আঁধার। তিনি দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন। অভিভাবক হারানোর বেদনার পাশাপাশি নতুন দিনের অনিশ্চয়তা ভর করে তার সংসারে।
১৯৮২ সালে, স্বামীর মৃত্যুর আট মাস পর রাজনীতির কঠিন পথচলায় যুক্ত হন এই নারী। গণতন্ত্রের জন্য তিনি সংগ্রাম শুরু করেন। স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তিনি।
১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া এরশাদ হটানোর এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। বিচক্ষণ ও দৃঢ় এই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি পান ‘আপোসহীন নেত্রী’ খেতাব। বেশ কয়েকবার গৃহবন্দি হলেও তিনি পিছু হটেননি। তার নেতৃত্বে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের যে বীজ রোপিত হয়েছিল, তার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৯০ সালে, ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়।
১৯৯১ সালে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। খালেদা জিয়ার হাত ধরে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যায়।
১৯৯৬ সালে স্বল্প মেয়াদের জন্য প্রধানমন্ত্রী থাকলেও জনদাবির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করেন বেগম জিয়া। ওই বছর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হন তিনি। সে সময় সংসদ ও রাজপথে নানা দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তিনি, যারা জাতীয়তাবাদী। মহানগর থেকে জেলা-উপজেলার প্রান্তিক জনপদে জনতার দাবি নিয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন।
২০০১ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। জীবনের কোনো নির্বাচনে পরাজয় বরণ করেননি এই মা, মাটি ও মানুষের নেত্রী। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের সময়ে বিএনপি নেত্রীকে কারারুদ্ধ করা হয়। দলের ভাঙনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। সে সময় দেশ ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া হলেও তিনি দেশ ছাড়েননি।
এরপর শুরু হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রাম। সামনে ছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে খালেদা জিয়া। সব মত ও পথের মতামত উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন বেগম খালেদা জিয়া।
সন্তানদের ওপর অমানবিক অত্যাচার, তারেক রহমানের নির্বাসন, আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যু এবং নিজের ওপর দমন-পীড়ন; এত কিছু সত্ত্বেও দমে যাননি বেগম খালেদা জিয়া।
লৌহকঠিন মনোবল নিয়ে জাতির জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি দৃঢ়তা ও অটল সাহসের প্রতীক হয়ে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি সামনে থেকে। ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে আয়োজনের অন্তরায় হিসেবে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে শেখ হাসিনা সরকার সংগ্রামী এই নেত্রীকে কারাবন্দি করে।
দুই বছরের বেশি সময় কারাগারে নিঃসঙ্গ জীবন কাটানোর পর শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি। পরিবার ও পরিজনহীন একাকিত্ব তাঁকে একলা জীবনের বাসিন্দা করে তুলেছিল। যে সংসারটি ছিল সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতনিদের সরব উপস্থিতিতে মুখর, জীবনের সায়াহ্নে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সেখান থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি ফিরোজার বাসভবনে নিঃসঙ্গ সময় কাটাতে বাধ্য হন। এর পরের সময়গুলো কাটে হাসপাতালের বিছানায়, জীবন ও মৃত্যুর বেদনাবহ টানাপড়েনে।
দীর্ঘ বছর ধরে বেগম জিয়ার আপোসহীন সংগ্রামের পথপরিক্রমায় নির্যাতিত ও সংগ্রামী মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের আগস্টে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনা সরকারের। বেগম জিয়াকে জাতির অভিভাবকের সম্মানে অধিষ্ঠিত করে আপামর ছাত্র-জনতা। সম্মানে সব মিথ্যা মামলা থেকে মুক্তি মেলে গণতন্ত্রের এই নেত্রীর।
স্বৈরাচারের পরশ্রীকাতরতায় দীর্ঘদিন উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত বেগম জিয়া মুক্ত পরিবেশে বেশিদিন থাকতে পারেননি। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর শেষ হয় গণতন্ত্রের জন্য জীবনভর লড়াই করা এই নেত্রীর জীবনযাত্রা। দেশজুড়ে নেমে আসে শূন্যতা। অসংখ্য মানুষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় বিদায় জানান আপোসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।
নিয়তির অনিবার্যতায় একটি মহাকালের পরিসমাপ্তি ঘটলেও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও গণতন্ত্র রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণে বেগম খালেদা জিয়া ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে থাকবেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন