প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বের সর্ববৃহৎ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে লাখো মানুষের জীবন। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বসতিগুলো বর্ষার টানা ভারী বৃষ্টিতে দিন দিন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রতিবছরই পাহাড় ধসে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় শিবিরবাসীদের মনে বৃষ্টি নামলেই বাড়ছে নতুন আতঙ্ক।
তবে স্থানীয় প্রশাসন এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয় জানাচ্ছে, পাহাড় ধসের ঝুঁকি কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং মেগাক্যাম্প বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির হিসেবে পরিচিত। এই আশ্রয়শিবিরের ৪ নম্বর ক্যাম্পে পাহাড় কেটে খাড়া ঢালে গড়ে তোলা হয়েছে শত শত ঝুপড়ি ঘর। বর্ষার টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের বেলে মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ছে। ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন স্থানে বালুভর্তি বস্তা ও ত্রিপল ব্যবহার করা হলেও পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না মাটির ধস। ফলে প্রতিটি ভারী বৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা, আর চরম জীবনঝুঁকি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা।
ক্যাম্প-৪ এর বাসিন্দা মো. রফিক তাঁর আতঙ্কের কথা জানিয়ে বলেছেন, 'বৃষ্টি হলেই আমাদের বুকে কাঁপন ধরে, প্রচণ্ড ভয় লাগে। কারণ যেকোনো সময় ওপর থেকে পাহাড় ধসে পড়তে পারে। জীবন বাঁচাতে বৃষ্টির রাতে আমরা ঘুমাতে পারি না, সবাই জেগে থাকি।'
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সলিম উল্লাহ জানিয়েছেন, 'ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসে পড়ে। এটা প্রতিবছরই হয়ে আসছে। পাহাড়ের ওপর থাকি, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সবসময় মরণের ভয়ে থাকি।'
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ৪ নম্বর ক্যাম্প নয়, উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে অন্তত ৮টি ক্যাম্প পাহাড় ধসের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশ ও খাড়া ঢালজুড়ে গড়ে ওঠা অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বাস করছেন এক লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। বর্ষায় টানা ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় তাঁদের উদ্বেগ এখন চরমে।
ক্যাম্প-৯ এর বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন জানিয়েছেন, 'পাহাড়ের ওপর ঘর নির্মাণ করেছি। এখন পাহাড়ের ওপরেও ঘর, নিচেও ঘর। কোন সময় ওপরের ঘর ধসে নিচের ঘরের ওপর পড়বে, সেই ভয়ে থাকি।' একই ক্যাম্পের বাসিন্দা সিরাজ বলেছেন, 'আমাদের তো আর কোনো উপায় নেই। বৃষ্টি হলেই পাহাড় ধসের আশঙ্কায় দিন কাটে।'
ক্যাম্প-১০ এর সি ব্লকের বাসিন্দা দিলদার বেগম বলেছেন, 'ক্যাম্পের জীবন আমাদের জন্য অনেক কষ্টের। পাহাড়ের পাদদেশে চরম ঝুঁকিতে বাস করতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে প্রতিবছরই পাহাড় ধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা খুবই ভয়ের মধ্যে আছি।'
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা ছৈয়দ আলম উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, 'ক্যাম্পে তো জায়গা খুব কম, কিন্তু মানুষ অনেক বেশি। খুবই ঘনবসতি। এখন পাহাড়ের ঢালে না থেকে আমরা যাব কোথায়?'
ঘনবসতি ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড় ধসের পাশাপাশি জলাবদ্ধতার আশঙ্কাও বাড়ছে। এই মানবিক ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়াতে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।
ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন সময় সংবাদকে বলেছেন, 'ক্যাম্পগুলো খুবই ঘনবসতিপূর্ণ এবং প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বাড়ছে। আমরা দেখছি অনেক মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করছেন, যেখানে আসলে তাদের থাকা নিরাপদ নয়। কেউ পাহাড়ের বিপজ্জনক ঢালে থাকছেন, যেখানে ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে; আবার কেউ এমন নিচু এলাকায় থাকছেন, যা ভারী বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়ে যায়। এটি একটি বড় সমস্যা।'
তিনি আরও বলেছেন, 'আমরা দুর্যোগের জন্য প্রস্তুতি, আগাম সতর্কবার্তা এবং ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন কাজ করছি। আমরা দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই, যেন তারা এসব উদ্যোগে সহায়তা অব্যাহত রাখে। শুধু জরুরি সাড়ার জন্য নয়, ঝুঁকি কমানো এবং দুর্যোগ প্রতিরোধে আগে থেকে বিনিয়োগ করা জরুরি। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে প্রাণহানি ও ক্ষতি দুটোই কমানো সম্ভব।'
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, বর্ষার শুরু থেকেই ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখার কাজ চলছে। প্রয়োজনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই প্রতিটি ক্যাম্পে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেছেন, 'ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোকে আমরা বিশেষ নজরদারিতে রেখেছি। ভারী বৃষ্টিপাত বেশি হলে বা পাহাড় ধসের লক্ষণ দেখা দিলে বাসিন্দাদের অস্থায়ী নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হবে। গত বছরও এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, এবারও তা করার জন্য আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা প্রস্তুত রয়েছে।'
উল্লেখ্য, গত ৮ বছরে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পাহাড় ধসের পৃথক ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গার প্রাণহানি ঘটেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন