প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ থেকে জন্ম নেওয়া তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। আন্দোলনকারীরা ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। দেশের মধ্যে এই স্লোগান নিয়ে নতুন আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার তীব্র গরমের মাঝে রাজধানীর জন্তর মন্তর এলাকায় বিক্ষোভের স্থলে তরুণদের উপস্থিতি ছিল চমকপ্রদ। কেউ তেলাপোকা মুখোশ পরে, কেউ ফুলের তোড়া, কেউ বই হাতে নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত ৩০ বছর বয়সি অভিজিৎ দিপকে।
অভিজিৎ দিপকে ভারতের রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ এবং বোস্টন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। তিনি গত ১৬ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর সূচনা করেন। এর আগে, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত আদালতে শুনানির সময় বেকার তরুণদের ‘পরজীবী’ এবং ‘তেলাপোকা’ হিসেবে তুলনা করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই উন্মোচন হয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।
গঠিত হওয়ার পর থেকেই ‘সিজেপি’কে মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা তীব্র সমালোচনার রোষে ফেলেছেন।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণের রিজিজু মন্তব্য করেছেন যে, ককরোচ জনতা পার্টির ২ কোটি ২০ লাখ ফলোয়ার মূলত চিরশত্রু পাকিস্তান এবং ‘ভারতবিরোধী গ্যাং’ থেকে উদ্ভূত। কিন্তু মন্ত্রী কিরেণের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন অভিজিৎ দিপকে।
এ প্রসঙ্গে বিজেপির নেতারা ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান আদান-প্রদানকে উস্কানিমূলক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সমাবেশে অভিজিৎ দিপকে অভিযোগ করেন যে, ভারতে সরকারবিরোধী মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করছে। তিনি বলেন, “আমার মা ভেবেছিলেন, দেশে ফিরলেই আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। শুধু আমার মা নয়, এই দেশের অনেক মায়েরই আশঙ্কা থাকে যে রাজনীতি নিয়ে কথা বললে অথবা সরকারের সমালোচনা করলে তাদের সন্তানেরা গ্রেপ্তার হতে পারে।”
যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এবং বিজেপি বিরোধীদের এই সমস্ত অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, সরকার সবসময় আইন ও সংবিধান মেনেই কাজ করছে।
এতকিছুর পরেও ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকে উস্কানি দিতে পিছপা হয়নি বিজেপির কর্মীরা। তারা বিক্ষোভে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে সিজেপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ‘দিল্লি পুলিশ লাঠি চালাও, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি’ স্লোগান দেন। সেই সঙ্গে জোরপূর্বক সমাবেশস্থল জন্তর মন্তরে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। এমতাবস্থায় তাদের কয়েকজনকে আটক করে দিল্লি পুলিশ।
উল্লেখ্য, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বাসস্থানের বাইরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ককরোচ জনতা পার্টি নিয়ে ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো রনজয় সেন বলেন, ‘আমি মনে করি না যে ভারত কোনো রাজনৈতিক উত্থানের ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ ভারত একটি বিশাল ও জটিল দেশ যেখানে যেকোনো রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাব বিস্তার করতে হলে শক্তিশালী বাস্তব উপস্থিতি এবং মাঠপর্যায়ের জনসমাবেশের প্রয়োজন হয়। শুধুমাত্র অনলাইন উপস্থিতি দিয়ে এটি সম্ভব নয়।’
বিশ্বের বৃহত্তম জেন জেড জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে এই আন্দোলন কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরাত মোহানি (১৮৭৫-১৯৫১) প্রথম ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি ব্যবহার করেন। পরে এ স্লোগানটি উপনিবেশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের নেতা ভগত সিংয়ের কণ্ঠেও স্থান করে নেয়।
‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে দিয়েছিলেন হাসরাত মোহানি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক জাফর আহমেদ ভূঁইয়া মতে, ইনকিলাব অর্থ বিপ্লব। অন্যদিকে জিন্দাবাদ মানে অভিনন্দন জানানো। ফলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানের মানে হলো বিপ্লবকে অভিনন্দন জানানো।
অবশ্য ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব তাঁর লেখাতে ইনকিলাব জিন্দাবাদের অর্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’।
অনেকে মনে করেন ইনকিলাব শব্দটি এসেছে মূলত আরবি ইকলাব শব্দ থেকে, যার অর্থ পরিবর্তন। আর জিন্দাবাদ শব্দটি উর্দু ও ফারসি ভাষার মিশেল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের তরুণেরা ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানটি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান মনেপ্রাণে ধারণ করে শরিফ ওসমান বিন হাদি ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেন। গত বছর ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। আহত ওসমান হাদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
কিছুদিন আগে, শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিষয়ে ইঙ্গিত করে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ গ্রেফতার করেছিল, যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়। হত্যাকারীরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে। বাংলায় আসার পর আমাদের এসটিএফ তাদের ধরে। এইটা তাদের কৃতিত্ব। তারপর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে আমাকে ফোন করে বলেন, আপ থোরা আপনা বেঙ্গল পুলিশ কো বলদো, এ বাদ বাহার মে নেহি কেহনে কে লিয়ে, এ দেশকে লিয়ে, অর্থাৎ আপনি রাজ্য পুলিশকে জানিয়ে দিন এটা যেন বাইরে না যায়। কারণ এটা দেশের ব্যাপার।’
মমতা অমিত শাহকে প্রশ্ন করে বলেন, ‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? আজ সরকার পরিবর্তন হলেও মনে রাখবেন, আমি কিন্তু সবটাই জানি। আমার হৃদয়টায় একটা কথার ভাণ্ডার, তথ্য ভাণ্ডার, সত্য ভাণ্ডার, আমি তো সম্পদের ভয়ে কর্মীদের জলে ভাসিয়ে দিয়ে চলে যাব না।
এতদিন আমি মুখ খুলিনি। কিন্তু আজকে অত্যাচার শেষ সীমায় গেছে বলে আমাকে মুখ খুলতে হয়েছে। আমি সেই নামটা বলতে চাইছি না, বললে বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে যাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন