প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দলে রয়েছে ব্রাজিল। দুর্দান্ত খেল শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হয়ে টুর্নামেন্টের নকআউটে পৌঁছেছে সেলেসাওরা। আর এদিকে, যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে বিশ্বকাপের পরবর্তী রাউন্ডে পৌঁছেছে সূর্যদয়ের দেশ জাপানও। এবার এশিয়ার জায়ান্টদের প্রতিপক্ষ ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। এর মধ্যেই ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন জাপানের কোচ হাজেমি মোরিয়াসু। ঠিক কোন জায়গায় এবারের বিশ্বকাপে জাপান সবার থেকে আলাদা?
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জাপান ডাগআউটে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রটি কোন অপরিচিত প্রযুক্তিগত যন্ত্র নয় বরং একটি সাধারণ সাদা হোয়াইটবোর্ড এবং একটি কালো মার্কার।
হাফটাইমের বাঁশি বাজতেই খেলোয়াড়দের ভিড় জমে সেই বোর্ডের চারপাশে। কয়েকটি সরল রেখা, কিছু তীরচিহ্ন, ছোট ছোট বৃত্ত। দেখা যাচ্ছে যন্ত্রণাগ্রস্ত কিন্তু সেই আঁকাতেই লুকিয়ে রয়েছে পরবর্তী ৪৫ মিনিটের যুদ্ধ পরিকল্পনা। জাপান কোচ হাজিমে মোরিয়াসুর বিশ্বাস, দীর্ঘ অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতার তুলনায় একটি স্পষ্ট চিত্র অনেক দ্রুত খেলোয়াড়দের মস্তিষ্কে পৌঁছাতে সক্ষম।
এবার সেই হোয়াইটবোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি, ম্যাথেউস কুনিয়ার তীক্ষ্ণ আক্রমণ এবং নেইমারের সৃজনশীলতা থামানোর জন্য নতুন ছক বর্তমানে সম্ভবত আঁকা হচ্ছে মোরিয়াসুর মার্কারের আঁচড়ের মাধ্যমে। ফুটবল বিশ্বের দৃষ্টি এখন তাই সাদা বোর্ডের দিকে।
জাপানের ফুটবল দর্শণ অন্যদের থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। তারা অযথা বলের দখল ধরে রাখতে আগ্রহী নয়। বরং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পাল্টা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়া তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
দাইচি কামাদা, ওয়াতারু এন্দো এবং কেইতো নাকামুরারা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পরিবর্তে দ্রুত ওয়ান টাচ পাস এবং নিখুঁত টাইমিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণের ফাঁক তৈরি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর সামনে ফেনুর্ডের স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার বুদ্ধিদীপ্ত অফ দ্য বল রান দিয়ে ডিফেন্ডারদের অবস্থান ভেঙে দেয় এবং গোলের সুযোগ তৈরি করে।
মোরিয়াসুর হোয়াইটবোর্ড কৌশলটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে সংগৃহীত।
প্রথমটি রিয়েল টাইম অ্যাডজাস্টমেন্ট। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের রক্ষণ কোথায় দুর্বল হচ্ছে, কোন স্থানে বেশি স্পেস তৈরি হচ্ছে, হাফটাইমেই সেগুলো চিহ্নিত করেছেন।
দ্বিতীয়টি জোনভিত্তিক নির্দেশনা। কোন দিক দিয়ে আক্রমণ গড়তে হবে, কোথায় ফুলব্যাকের পেছনের ফাঁকা জায়গায় বল ফেলতে হবে, কিংবা কখন খেলোয়াড়দের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে, সবকিছু বোঝানো হয় সহজ রেখাচিত্রের মাধ্যমে।
তৃতীয়টি মানসিক স্বচ্ছতা। জটিল ট্যাকটিক্যাল ব্যাখ্যার পরিবর্তে সহজ ভিজ্যুয়াল নির্দেশনা খেলোয়াড়দের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ফলে মাঠে বিভ্রান্তি কমে এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
শুধু পরিকল্পনা নয়, ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বদলালে মুহূর্তেই নিজের কৌশল পরিবর্তন করেন মোরিয়াসু। এই বিশ্বকাপে জাপান বেশিরভাগ সময় ৩-৪-২-১ ফর্মেশনে খেললেও বলের নিয়ন্ত্রণ পেলে সেগুলো দ্রুত ৩-৪-৩ তে রূপান্তরিত হয়। প্রতিপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই পুরো আক্রমণ কাঠামো পাল্টে যায়। এক পাশ দিয়ে একাধিক খেলোয়াড় নিয়ে প্রতিপক্ষকে আকৃষ্ট করে জাপান। এরপর হঠাৎ করে খেলা বিপরীত উইংয়ে ঘুরে যায়। সেই মুহূর্তে তৈরি হয় নতুন আক্রমণের রাস্তা। দ্রুত ট্রানজিশন, নিখুঁত ওয়ান টাচ পাসিং এবং অসাধারণ অফ দ্য বল মুভমেন্টই এখন সামুরাই ব্লুদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কাগজে কলমে ব্রাজিলই টেবিলে সম্ভবত এগিয়ে রয়েছে। ইতিহাস, তারকা এবং অভিজ্ঞতায় সেলেসাওদের পাল্লা ভারী। তবে আধুনিক ফুটবল বারবার প্রমাণিত হয়েছে, শুধু বড় নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা সম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা, নিখুঁত বাস্তবায়ন এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল দিয়ে যেকোনো পরাশক্তিকে চাপের মধ্যে ফেলা সম্ভব।
এখন দেখার বিষয়, হাজিমে মোরিয়াসুর সেই সাদা হোয়াইটবোর্ডে আঁকা নতুন ছক কি আরেকটি বিশ্বকাপ বিস্ময় সৃষ্টি করে, নাকি ব্রাজিলের দখলদার আক্রমণের সামনে সামুরাই ব্লুদের স্বপ্ন থেমে যাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন