প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। বিলের পানিতে কুয়াশার আবহ বিরাজমান। চারপাশের নীরবতার মধ্যে কেবল পানিতে লগি-বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় চড়ে বিলপাড়ের শত শত দরিদ্র মানুষ শামুক সংগ্রহ করছে।
গোপালগঞ্জের বিভিন্ন বিল ও জলাশয়ে বর্ষা মৌসুমে এমন দৃশ্য দেখা যায়। সদর উপজেলার সাতপাড়, বলাকোড়, বড়খোলা, কাশিয়ানীর সিংগা, বরইভিটা, রাহুথড়, বরমপাল্টা, পাথরগ্রাম; মুকসুদপুরের চান্দার বিল এবং টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণিবিল, বাঘিয়ারকুল, জোয়ারিয়ার বিলসহ জেলার বিভিন্ন জলাভূমি থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক অবাধে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এই শামুকগুলো পরে স্থানীয় সিংগা গ্রামের মল বাজার, বরমপাল্টা এবং কোটালীপাড়ার রামনগর বাজারে জমা হচ্ছে। প্রতিদিন এইভাবে শামুক সংগ্রহ ও বেচাকেনা চলছে। এছাড়া গ্রাম ঘুরে সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ বিক্রেতার কাছ থেকে বস্তাভর্তি শামুক কিনছেন ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা। সেখান থেকে তা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মাছের ঘেরে পাঠানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, জেলার বিভিন্ন বিল ও আশপাশের জলাশয় থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ বস্তা শামুক সংগ্রহ ও কেনাবেচা হচ্ছে। এতে জড়িত সংগ্রহকারী, ফড়িয়া ও পাইকার ব্যবসায়ীরা। ফলে এটি একটি বড় স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গড়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামুক সংগ্রহ ও বেচাকেনার মাধ্যমে এর সঙ্গে জড়িতদের পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা এবং সংসারের খরচ চলে, কিন্তু এই বাণিজ্যের আড়ালে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বিলের চেহারা। একসময় যে পানিতে অসংখ্য শামুক দেখা যেত, এখন সেখানে আগের মতো শামুক চোখে পড়ে না।
শামুকের খোঁজে মানুষ
সিংগা গ্রামের শামুক সংগ্রহকারী সমীর বিশ্বাসের দিন শুরু হয় খুব ভোরে। বর্ষা মৌসুমে বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করেই তার সংসার চলে। তিনি বলেন, ‘বিল বা জলাশয় থেকে শামুক তুলি। সেই শামুক বিক্রি করে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাই ‘
সমীর জানান, আষাঢ় মাস থেকে শামুক তোলা শুরু হয় এবং এটি চলে আশ্বিন মাস পর্যন্ত। বিলে শামুক কম থাকায় প্রতিদিন একজন সংগ্রহকারী চার-পাঁচ বালতি মাঝারি আকারের শামুক সংগ্রহ করতে পারেন। প্রতি বালতি বিক্রি হয় ৮০ টাকা দরে।
একই গ্রামের আরেক সংগ্রহকারী প্রশান্ত ঢালীর কাছে শামুক মৌসুমি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তিনি বলেন, ‘আমরা সিংগা ও চান্দার বিল থেকে শামুক তুলি। বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এসে এসব শামুক কিনে নিয়ে যান। ৫৫ কেজির প্রতিবস্তা শামুক বিক্রি করি ৪৮০ টাকায়। এতে আমরা আর্থিকভাবে উপকৃত হই।’
সিংগা উত্তরপাড়ার মল্লিক বাড়ির অনাধি মৌলিকের জীবনেও বর্ষার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শামুক সংগ্রহ। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তার কাজ শুরু হয়। সকাল ৯টা পর্যন্ত বিলের পানিতে শামুক ও শাপলা সংগ্রহ করেন তিনি।
অনাধির ভাষ্য, এই কাজ করেই বর্ষা মৌসুমের আয়-রোজগার হয়। দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পিরোজপুর থেকে পাইকাররা এসে শামুক কিনে নিয়ে যান। গতবছর বিলে শামুক খুবই কম ছিল, আয়ও কম হয়েছে। এবার তুলনামূলক একটু বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
বিল থেকে চিংড়ি ঘেরে
স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী অরুণ গোলদার বলেন, ‘বিল এলাকার মানুষদের কাছ থেকে শামুক কিনে বাগেরহাটের চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। খরচ বাদে বস্তাপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা লাভ হয়। যা হয় তা দিয়ে ভালোই আছি।’
অপর পাইকারি ব্যবসায়ী সমর মজুমদার, অশোক সরকার ও পরেশ বিশ্বাসের ভাষ্য, ‘আমরা বিলপারের শ্রমিকদের কাছ থেকে ঘুরে ঘুরে শামুক কিনি। তবে আগের মতো শামুক পাওয়া যায় না। অথচ চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে বেশ।’
তারা বলছেন, বিলের একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। তবে ইরিবোরো চাষাবাদে অতিরিক্ত মাত্রায় কিটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে শামুকের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটছে।
শামুক শুধু শামুক নয়
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘নির্মল পানি পেতে শামুকের ভূমিকা রয়েছে। বিল বা জলাশয়ের আবর্জনা ও বিভিন্ন দূষিত বস্তু খেয়ে শামুক জীবনধারণ করে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। জলাভূমি রক্ষায় শামুকের গুরুত্ব অনেক।
ড. রাশেদুজ্জামানের মতে, জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে ছোট প্রাণী বলে কোনো প্রাণীই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। শামুকও তার বাইরে নয়। জলজ পরিবেশের জৈবিক প্রক্রিয়ায় শামুকের ভূমিকা রয়েছে বেশ। জলাশয়ের বিভিন্ন জৈব পদার্থ ও আবর্জনা খাওয়ার মাধ্যমে শামুক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতার প্রয়োজন
এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জলজ প্রাণী ও মৎস্য সংরক্ষণে সর্বদা সচেষ্ট। গোপালগঞ্জের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কাজ করছি। লোকবল সংকট থাকা সত্ত্বেও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জলজ প্রাণী ও মৎস্য রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন।
‘শামুক সংগ্রহকারী ও বিক্রেতাদের সঙ্গে সভা করে অতিরিক্ত শামুক আহরণ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করি উদ্যোগটি ফলপ্রসু হবে’- বলেন এই মৎস্য কর্মকর্তা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন