প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নাটোরের লালপুর উপজেলায় লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) বর্তমানে এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়ে রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের টিকার তীব্র সংকট, যথাযথ চিকিৎসার অভাব এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে কৃষকরা প্রতিদিনই গরু হারাচ্ছেন।
উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার গরু এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩৬ টি গরুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষুদ্র খামারি পথে বসার উপক্রম হয়েছে, কারণ একদিকে গরুর মৃত্যু আর অন্যদিকে ঋণের বোঝা।
বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নওসারা সুলতানপুর গ্রামের ছোট খামারী হাবিল উদ্দিনের ছেলে মো. ফিরোজ আলীর কাহিনী এই সংকটের একটি দৃষ্টান্ত। তার খামারে ছিলো ৫টি গরু, তবে এই রোগের কারণে তাকে অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে। পরে আবার ৩ টি গরু কিনলেও, তার মধ্যে একটি গরুর ৩ মাসের বাচুর লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে।
ফিরোজ আলী বলেন, প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন হলো আক্রান্ত গরু পড়ে আছে। তারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করলেও কোন প্রতিকার মেলেনি। তবে ঝাড়ফু ও হোমিও ট্রিটমেন্ট নিয়ে চিকিৎসা করছেন। নিজের টাকা খরচ করে আরও দুইটি গরুর ল্যাম্পি রোগের টিকা দিয়েছেন। সরকারের সময়মতো টিকা দেওয়া হলে কৃষকের এই ক্ষতি হতো না।
গত বুধবার (৮ জুলাই) সরেজমিনে পদ্মা তীরবর্তী বিলমাড়িয়া ইউনিয়নে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এখানে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয়েছে এবং বিল্লাল আলী নামের এক কৃষকের ২টি গরুর মৃত্যু হয়। গত এক মাসে মহরাজপুর, নাশোষা, নওশারা ও সুলতানপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয় পশু পল্লী চিকিৎসক মোসলেম উদ্দিন জানান, শুধু বিলমাড়িয়া ইউনিয়নেই গত এক মাসে ৪৫ থেকে ৫০ টি গরু মারা গেছে এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গরু আক্রান্ত হয়েছে। যদিও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মে মাস থেকে ৩৬ গরুর মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, স্থানীয়রা বলছেন প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
নওসারা সুলতানপুর গ্রামের মো. নুর নবী ঘোষ জানান, তার খামারের ৬টি গরু ইতোমধ্যে মারা গেছে এবং এখনো ৩টি আক্রান্ত। পশু হাসপাতালে গিয়েও কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি। একই গ্রামের মো. টুটুল ইসলামের ২টি গরু আক্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। বারবার পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাননি বলে অভিযোগ করেন। এই সংকটের মধ্যে মো. ফিরোজ আলী ও শাহানাজ পারভীনও রয়েছেন।
পানসিপাড়া গ্রামের দিনমজুর কামরুল ইসলামের একটি গরু ১০ দিন ধরে আক্রান্ত। তিনি হোমিও চিকিৎসা, ধূপ ও নিমপাতা ব্যবহার করে চিকিৎসার চেষ্টা করছেন। ফতেপুর গ্রামের জোসনার গরুটি ১০ দিন ধরে আক্রান্ত, কিন্তু কোনও আধুনিক চিকিৎসা না পাওয়ায় ঘরোয়া উপায়ে চিকিৎসা চালাচ্ছেন।
বিজলী নামের এক নারীও একইভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তার গরুও দীর্ঘদিন ধরে আক্রান্ত, কিন্তু সঠিক চিকিৎসা ছাড়া অবস্থার অবনতি হচ্ছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে লালপুরে প্রথম এই রোগ সংক্রমণ ঘটে।
লালপুর উপজেলায় মোট ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২২টি গরুর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গরু ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন, যেখানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গরু আক্রান্ত। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৩৫০ ডোজ টিকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, ফলে টিকাদান কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যেখানে অন্তত ৫০ হাজার ডোজ টিকার প্রয়োজন ছিল।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে কিছু তথ্যের গরমিল থাকতে পারে। আমরা প্রকৃত তথ্য যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’ তিনি আরও জানান, নতুনভাবে জুলাই মাসের জন্য ২৫ হাজার ডোজ টিকার চাহিদা পাঠানো হলেও এখনও সরবরাহ আসেনি।
এদিকে ভেটেনারি সার্জন ডা. শুভ কুমার দাস খামারিদের সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
টিকার অভাব, চিকিৎসার সংকট এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে লালপুরের খামারিরা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি হস্তক্ষেপ ও পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহের অভাবে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন