প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইরানের ক্ষমতাসীন দলের কট্টরপন্থী আইন প্রণেতা হামিদ রাসাইকে ১০ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। তিনি দেশের বর্তমান সংসদে দায়িত্ব পালনকালে কারাগারে যাওয়া প্রথম ক্ষমতাসীন এমপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। রাসাইয়ের কারাদণ্ডের ঘটনায় সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবফ ও প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেন মোহসেনি-এজেইয়ের বিরুদ্ধে অতি-রক্ষণশীলদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের কারণে রাসাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ওই প্রতিবেদনে গালিবফের বিরুদ্ধে সংসদীয় নথি বিকৃত করার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পরে একটি বিশেষ ধর্মীয় আদালত রাসাইকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে দেশটিতে যখন তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, তখন রাসাইয়ের কারাদণ্ড ক্ষমতাসীন রক্ষণশীলদের মধ্যে বিভাজনকে আরো স্পষ্ট করেছে। রাসাই ইরানের অতি-রক্ষণশীল রাজনীতির একজন পরিচিত মুখ। তার কারাদণ্ড নিয়ে অতি-রক্ষণশীলদের একাংশ গালিবফ ও মোহসেনি-এজেইয়ের ভূমিকার সমালোচনা করছেন।
তবে রাসাইয়ের বিরুদ্ধে মামলার বিস্তারিত কারণ এবং আদালতের রায় সম্পর্কে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাই এসব দাবিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৩ সালে তেহরান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন হামিদ রাসাই। এর আগে তিনি কট্টরপন্থী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘৯ দে’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ‘গালিবফের সংসদীয় নথিতে কারসাজি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে রাসাইকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ওই প্রতিবেদনের জন্য তার বিরুদ্ধে অন্যদের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে রাসাই সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই গালিবফ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। রাসাই একজন ধর্মগুরু হওয়ায় তার মামলার বিচার করা হয় ধর্মগুরুদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ আদালতে।
বাস্তববাদী বনাম কট্টরপন্থী
আইআরএএম সেন্টার ফর ইরান স্টাডিজের (আইসিআইএস) গবেষক রহিম ফারজাম মন্তব্য করেছেন, পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের রক্ষণশীল শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে ক্রমেই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছে। এক পক্ষকে তিনি আলোচনার পক্ষে থাকা বাস্তববাদী এবং অন্য পক্ষকে আলোচনার বিরোধী কট্টরপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেন।
তার মতে, এই দুই পক্ষ ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কৌশল ও নীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এই ধারণা এখন শুধু গণমাধ্যমেই নয়, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও আলোচনা হচ্ছে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা ও রাজনীতিক মনে করছেন, দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা থেমে যাওয়ার মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো নয়।
অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা
শিক্ষাবিদ রহিম ফারজাম বলেন, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ ও অচলাবস্থাও দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনা থেমে যাওয়ার একটি কারণ।
তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার দায় যদি প্রতিপক্ষের অভ্যন্তরীণ সমস্যার ওপর দেওয়া যায়, তাহলে দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই ব্যর্থতার রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমানো যায়।’ ফারজাম আরো বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজনের বিষয়টি কূটনৈতিক অগ্রগতি না হওয়ার একটি সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে কাজ করছে।
এর ফলে ওয়াশিংটন একদিকে নিজেকে আলোচনার জন্য প্রস্তুত বলে তুলে ধরতে পারে, অন্যদিকে আলোচনায় অচলাবস্থার দায় ইরানের বিভক্ত ও অসংগঠিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থার ওপর দিতে পারে।
ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব
তবে আইসিআইএসের জন্য লেখা এক প্রতিবেদনে ফারজাম বলেন, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্প্রতি ঐক্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং জাতীয় ঐক্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইরানের নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ—তিনটি বিভাগই নিজেদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও একই বার্তা দিয়েছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘সব মিলিয়ে এসব বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইরানের নেতৃত্ব নিজেদের মধ্যে বিভক্ত, এমন ধারণার বিরোধিতা করার জন্য একটি পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে এসব বক্তব্য দেখায় যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কোনো নিয়ন্ত্রণহীন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে নেওয়া হচ্ছে না।’
কট্টরপন্থীদের সমালোচনা ও বিক্ষোভের হুঁশিয়ারি
রাসাইকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় পায়দারি পার্টি এবং সাবেক পারমাণবিক আলোচক সাঈদ জলিলির ঘনিষ্ঠ কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও গণমাধ্যমগুলো তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে। রাসাইয়ের সমর্থকেরা গালিবফের বিরুদ্ধে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার অভিযোগ করেছেন। তারা আরো অভিযোগ করেছেন, দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের চেয়ে গালিবফ ব্যক্তিগত বিরোধকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কোমের আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-মানান রাইসি গালিবফসহ অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। দুই বছর আগে কোম শহরে সাঈদ জলিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাইসি।
রাইসি লিখেছেন, ‘আমার মনে হয়, এমন পরিস্থিতিতে মানুষ আপনাকে কোনো মসজিদ, সমাবেশ, জনসমাগম বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যেতে দেবে না। সেখানে আপনি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়তে পারেন।’
রাজা নিউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং পায়দারি পার্টির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মেসাম নিলি বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে অবিচার ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, পায়দারি পার্টির ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম ও রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে একটি ‘অভ্যুত্থান’ চালানোর চেষ্টা হচ্ছে।
কট্টরপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী মোহসেন মাগসুদি প্রশ্ন তুলেছেন, ঐক্য বজায় রাখতে এবং লাখ লাখ ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করা একজন এমপিকে ১০ মাসের জন্য দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া ঠেকাতে তিন বছর আগের একটি সংবাদ প্রতিবেদন নিয়ে করা অভিযোগ কেন প্রত্যাহার করা হলো না।
সাম্প্রতিক কয়েকটি সরকারপন্থী রাতের সমাবেশেও এই সমালোচনা দেখা গেছে। তাবনাক ওয়েবসাইট প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কট্টরপন্থীদের রাসাইয়ের সমর্থনে এবং গালিবফের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। তাবনাক তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, অল্পসংখ্যক মানুষ এসব সমাবেশকে নিজেদের দলীয় স্বার্থ পূরণের জন্য ব্যবহার করছে।
আসল প্রশ্ন
ফারজাম বলেন, ‘আসল প্রশ্ন হলো, ইরানের মধ্যে মতবিরোধ আছে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, এসব মতবিরোধ কি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবস্থানকে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?’
আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া ফারজাম বলেন, ‘এ বিষয়ে বাইরের অনেক পর্যবেক্ষক যে ধারণা করছেন, তার পক্ষে প্রমাণ খুব বেশি শক্তিশালী নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘তাই এই বিষয়টিকে শুধু আলোচনার পক্ষে ও বিপক্ষে থাকা দুই পক্ষের লড়াই হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটিকে এমন একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা ভালো, যেখানে একই রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে বিভিন্ন মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকা মতবিরোধ সামলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বিশৃঙ্খলা আর বিভাজন এক নয়
ফারজাম বলেন, ইরানের নেতৃত্বকে একই সময়ে নানা ধরনের চাপ সামলাতে হচ্ছে। একদিকে তাদের কৌশলগতভাবে নমনীয় থাকতে হচ্ছে, অন্যদিকে আত্মসমর্পণের মতো কোনো বার্তা এড়াতে হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিরোধ ব্যবস্থা ধরে রাখা, অতিরিক্ত উত্তেজনা ঠেকানো এবং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের আদর্শের প্রতিও অনুগত থাকতে হচ্ছে।
ফারজামের মতে, এটি একটি কঠিন ‘ভারসাম্য রক্ষার কাজ’। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় মতবিরোধ থাকতেই পারে এবং বাইরে থেকে কখনো কখনো পরিস্থিতিকে বিশৃঙ্খল মনে হতে পারে। তবে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধকে প্রতিষ্ঠানের ভেঙে পড়ার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। সহজ কথায়, বিশৃঙ্খলা আর বিভাজন এক বিষয় নয়।
ফারজাম বর্তমানে তুরস্কের এসকিশেহির ওসমানগাজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পিএইচডি করছেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ইরানের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্পর্ক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন