প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজধানীর স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকার নামে কয়েক শ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বলে জানা গেছে। আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি থেকে প্রতিষ্ঠানটির নামে এসব ঋণ দেওয়া হয়।
ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে স্কলাস্টিকা লিমিটেডের মোট দায় ৭৩০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৭২৭ কোটি টাকাই খেলাপি। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ মিলিয়ে বিপুল এই অর্থের দায়ে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর ভর্তি ও অন্যান্য ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে প্রতিষ্ঠান। তবে প্রশ্ন উঠছে, উচ্চ হারে ফি আদায় করার পরও কেন প্রতিষ্ঠানটির এমন বিপুল অর্থ ঋণ করার প্রয়োজন হলো বা সেই টাকা কোথায় গেল।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ‘ক্রিসেন্ট লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির অনুকূলে সোয়া চারশ কোটি টাকারও বেশি অর্থ প্রদান করেছে স্কলাস্টিকা। যদিও খাতা-কলমে কোম্পানিটির অস্তিত্ব রয়েছে, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। নথিতে উল্লেখিত ঠিকানায় এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। এমনকি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং তাদের কার্যক্রম ঘিরেও রহস্য তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি কালবেলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিস অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি ঘেঁটে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে ছিলেন সালাউদ্দিন খান মজলিস, আব্দুর রউফ ও গাজী মনিরুল ইসলাম। তাদের মধ্যে আব্দুর রউফ কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাকি দুজন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের দুই শীর্ষ ব্যক্তি আব্দুর রউফ ও সালাউদ্দিন মজলিস আগে ‘নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানেরও পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। এই সূত্র ধরে সামনে এসেছে আর্থিক খাতের আলোচিত ব্যক্তি সালমান এফ রহমানের নাম। তৎকালীন সময়ে সালমান এফ রহমান একদিকে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন, অন্যদিকে নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ছিল তার মালিকানাধীন বিতর্কিত বেক্সিমকো গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। প্রভাবশালী মহলের এই যোগসাজশেই স্কলাস্টিকার শত শত কোটি টাকা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পাচার বা সরিয়ে ফেলা হয়েছে কি না, এখন জোরালোভাবে উঠছে সেই প্রশ্ন।
আইএফআইসি ব্যাংকের নথি ও তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্কলাস্টিকা দীর্ঘমেয়াদে ৩১৯ কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৩৭৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এই পাহাড়সম ঋণের বোঝা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, ঋণগুলো পুনঃতপশিল করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা তুললেও কেন প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাংক থেকে সাড়ে সাতশ কোটি টাকার কাছাকাছি ঋণ নিতে হলো এবং সেই ঋণের সিংহভাগ কেন খেলাপিতে পরিণত হলো।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও অগ্রহণযোগ্য বিষয় হলো, যে প্রতিষ্ঠান নিজেই বড় ধরনের ব্যাংক ঋণে জর্জরিত এবং খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত, তাদের আবার শত শত কোটি টাকা দিচ্ছে এমন একটি কোম্পানিতে, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।
আরজেএসসির নথি অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফের ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল রাজধানীর অভিজাত ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১ নম্বর রোডের ৪৮ নম্বর বাড়ি। কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, ধানমন্ডির ১ নম্বর রোডে জোর সংখ্যার ক্রমানুসারে কোনো বাড়ির অস্তিত্বই নেই।
একইভাবে কোম্পানিটির অন্যতম পরিচালক গাজী মনিরুল ইসলামের ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছিল মিরপুর-১-এ বেক্সিমকো রিয়েল এস্টেটের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘মুনসী লেক ভিউ অ্যাপার্টমেন্টের’ ৮/২ নম্বর ভবন। তবে ওই এলাকায়ও ৮/২ নম্বরের কোনো বাড়ির নাম-নিশানা পাওয়া যায়নি। যদিও ওই আবাসিক এলাকার বি-২ নম্বর ভবনে গাজী মনিরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির সন্ধান মেলে, তবে তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন এবং এই ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের দেওয়া ইস্কাটন প্লাজার ঠিকানায় খোঁজ নিতে গেলে সেখানকার নিরাপত্তা কর্মীরা জানান, সালাউদ্দিন খান মজলিস অনেক আগেই মারা গেছেন। তার পরিবারের সদস্যরাও ওই বাসায় উপস্থিত ছিলেন না। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি ও ভুয়া ঠিকানাকে ঢাল বানিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক নিখুঁত ছক কষা হয়।
অনুসন্ধানী তথ্যে উঠে এসেছে আরও এক চাঞ্চল্যকর সমীকরণ। জানা গেছে, স্কলাস্টিকা স্কুল এবং এর মূল অভিভাবক প্রতিষ্ঠান ‘এসেন্ট গ্রুপ’-এর অন্যতম প্রধান শুভাকাঙ্ক্ষী ও সেবাগ্রহীতা ছিলেন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। অর্থাৎ স্কলাস্টিকার মালিকপক্ষের সঙ্গে পরোক্ষভাবে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখতেন প্রভাবশালীদের তালিকায় থাকা সালমান এফ রহমান।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সালমান এফ রহমানের নিজস্ব মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তারা ছিলেন স্কলাস্টিকা থেকে সোয়া চারশ কোটি টাকা পাওয়া এই ভুয়া প্রতিষ্ঠান ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নেতৃত্বে। ফলে ব্যাংকের টাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থ কৌশলে প্রভাবশালীদের পকেটে গেছে কি না, উঠছে সেই প্রশ্ন।
স্কলাস্টিকা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট কূটনীতিক ইয়াসমিন মুর্শেদ। ২০২৩ সালে তার প্রয়াণের পর থেকে স্কুলটি পরিচালনার সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন সৈয়দা মাদিহা মুর্শেদ। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নিয়ে তা খেলাপিতে পরিণত করার পেছনে বর্তমান ও সাবেক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় অ্যাসেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং স্কুলটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সৈয়দা মাদিহা মুর্শেদের সঙ্গে। তবে বিভিন্ন সোর্স মারফত নিশ্চিত হওয়া গেছে, তিনি দেশের বাইরে আছেন। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
তবে স্কলাস্টিকা লিমিটেডের কো-অর্ডিনেটর (কমিউনিকেশন এক্সিকিউটিভ অফিস) জিয়া হাসান বলেন, ঋণের বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করছি। তারা যে ধরনের নির্দেশনা দিচ্ছেন, সে অনুসারেই এগোচ্ছি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন