প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
অভাবকে জয় করে তাদের নিজেদের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর নিরন্তর চেষ্টা করে চলেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তবে সঠিক সুযোগ ও পুঁজি না থাকায় তাদের জীবনযাত্রায় বারবার ছন্দপতন ঘটে গেছে। জেলার দুর্ভোগে থাকা বেশ কিছু আদিবাসী পল্লির চিত্র ঠিক এমনই। একসময় প্রতিদিন কাজের সন্ধানে ছুটতে হতো পথে-প্রান্তরে, নতুবা চুলোয় হাঁড়ি উঠতো না। বর্তমানে কিন্তু তাদের জীবনে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে, বাড়িতে শুরু হয়েছে পশু পালন, হাঁস-মুরগি লালন-পালনের পাশাপাশি সবজি ও ধান চাষও করা হচ্ছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বিশ্ব আদিবাসী দিবসে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নারগুন ইউনিয়নের কহরপাড়া গ্রামের আরতি মার্ডির জীবন বদলের গল্পটা যেন প্রমাণ করে দেয় যে, সুযোগ, প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে প্রান্তিক আদিবাসী মানুষ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম।
পঞ্চাশের কোঠায় পৌঁছানো আরতি মার্ডির রয়েছে পাঁচ সদস্যের একটি পরিবার। একসময় তার নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি না থাকায় খাসজমিতে ছাপড়া তুলে বসবাস করতে হতো। তিনি দিনমজুর স্বামী ও সন্তানের সংসার চালাতে গিয়ে যথেষ্ট কষ্টে ছিলেন। জীবনের সেই কঠিন সময়ে ২০১৯ সালের অক্টোবরে উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও-র 'পাথওয়েজ টু প্রসপারিটি ফর এক্সট্রিমলি পুওর পিপল (পিপিইপিপি)' প্রকল্পের মাধ্যমে যুক্ত হন 'প্রসপারিটি বনফুল ইকো গ্রাম কমিটি'-তে। করোনাকালে প্রকল্পের সাহায্যে পাওয়া ৯ হাজার টাকার বিনিময়ে একটি ছাগল কেনার মাধ্যমে তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের সূচনা হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি সরকারি ঘর ও প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে একটি গাভী পান। সংস্থাটির থেকে পাওয়া সহজ শর্তের ঋণ ও সহায়তায় তিনি ৫৫ শতাংশ জমিতে মিষ্টি কুমড়া এবং ৫০ শতাংশ জমিতে ধান-সবজি চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার ৩টি গাভী, ৫টি ছাগল, ৫টি হাঁস এবং ১৫টি মুরগি রয়েছে। এখন তিনি সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু থেকে মাসিক আয় পাচ্ছেন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সেটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রায় ১২ লাখ টাকার সম্পদ গড়তে সক্ষম হয়েছেন। তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পেয়েছেন ‘শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা’ পুরস্কার।
নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে আরতি মার্ডি বলেন, 'একসময় প্রতিদিনের খাবারের চিন্তায় ঘুম হতো না। ইএসডিও-র পরামর্শ ও সহায়তায় ধীরে ধীরে সবজি চাষ ও পশু পালন শুরু করি। এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারছি।'
একই ইউনিয়নের নালাডাঙ্গী এলাকার শান্তি মার্ডির গল্পটিও অনুপ্রেরণা যোগায়। দিনমজুর স্বামীর সামান্য আয়ে চলতে থাকা সংসারে তিনি ইএসডিও-র সহায়তায় ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) উৎপাদন শুরু করেন। সংস্থার তরফে ৫০ হাজার টাকা অনুদান পেয়ে ৬টি সেটে কেঁচো সার তৈরি করছেন তিনি। প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে সার বিক্রি করে মাসে বর্তমানে তার আয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
আদিবাসী পল্লির আরতি ও শান্তির মতো অন্যান্যদের জীবনেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন, যেমন মিনতি সরেন, চিন্তামনি মুর্মু, জসপিনা মুর্মু, সখিনা সরেন এবং সুমি হাসদার জীবনেও। তবে জীবনের মান আরও উন্নয়ন করার জন্য স্থানীয়রা সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবী জানান। আদিবাসী নারীরা বলছেন, 'আমাদের জীবন অনেকটাই বদলেছে। তবে সরকার যদি সমতল আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন, চাকুরির কোটা পুনর্বহাল, দখলকৃত ভূমি উদ্ধার এবং শিল্প-সংস্কৃতি রক্ষার স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে আমাদের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব।'
এ বিষয়ে ইএসডিও-র টেকনিক্যাল অফিসার মো. জান্নাতুল ফেরদৌস এবং টিম লিডার মোছা. মোসলেমা খাতুন জানান, কেবল আর্থিক সহায়তাই শেষ কথা নয়। প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষি ও পশুপালনে যুক্ত করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সরকারি সেবায় তাদের সম্পৃক্ত করা মূল লক্ষ্য। আরতি ও শান্তির মতো নারীদের সফলতা এখন পুরো পল্লির অন্যান্য পরিবারের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন