প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় পুশ ইন চেষ্টায় দুই সীমান্তের শূন্যরেখায় তিন দিনের অধিক সময় ধরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন ৯ জন নারী, শিশু ও পুরুষ। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সন্ধ্যায় সেখানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ‘গানপয়েন্টে’ মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখা গেছে।
রোববার (১৪ জুন) ভোর ৪টার দিকে বিএসএফ রৌমারী গয়টাপাড়া ও ভুন্দুর সীমান্তের মধ্যে অবৈধভাবে তাদের পুশ ইন করার চেষ্টা করে। বিজিবি ও স্থানীয়রা বাধা দিলে উভয়ের মাঝে ধাওয়া পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শিশু এবং নারীরা। কাঁটাতারের দিকে একবার এবং শূন্যরেখায় ঠেলাঠেলিতে চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন পুশ ইনের শিকার অসহায় মানুষগুলো।
গয়টাপাড়া সীমান্তে পুশ ইনের শিকার ২ জন শিশু, ১ জন নারী এবং ২ জন পুরুষ।
পুশ ইনের শিকার সুমি আক্তার বলেন, “গত তিন দিন ধইরা আমরা এই গরমে এই জায়গায় আছি। কোলে ৬ মাসের ও ৪ বছরের শিশুসন্তান রয়েছে। খাবার নাই, পানি নাই, মাথার উপর ছাদ নাই। বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে, কিছুই খাবার দিতে পারছি না। অনেকে বিস্কুট ও রুটি দিচ্ছে, তাই দিয়ে ক্ষুধা মেটাচ্ছি।”
সুমি আক্তার আরও বলেন, “২৭ দিন আগে সিলেট দিয়ে বাবা-মাসহ কাজের সন্ধানে অবৈধপথে ভারত যাই। ইন্ডিয়ান পুলিশ আমাগো ধরে বিএসএফের হাতে তুলে দেয়। এখন আমাদের কেউ নিচ্ছে না।
আমাগো বাঁচান। অন্যায় হলে সাজা দেন, তাও বাঁচান,” জানিয়ে সুমির স্বামী বেলাল জানান, “ছোট পোলাপান লইয়া আমরা খুব দুর্ভোগে আছি। পানি নাই, পায়খানা নাই, বউ ও ছাওয়াল নিয়ে খুব অসুবিধায় আছি। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরমে বাচ্চা দুইটি অসুস্থ হয়ে আছে। জীবনে অনেক বড় ভুল করছি, বাঁচি থাইলে এই কাজ আর করব না।”
গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে পুশ ইনের শিকার ব্যক্তিরা দাবি করেন, তারা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা।
এদিকে রোববার (১৪ জুন) সকালে বিজিবি এবং বিএসএফের পক্ষ থেকে কোম্পানি পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ পুশ ইনের ঘটনাটি অস্বীকার করে, ফলে বৈঠকটি সমাধান ছাড়াই ব্যর্থ হয়। বিজিবি অবৈধ পুশ ইন বন্ধ করে শূন্যরেখায় অবস্থানকারী ৯ জনকে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করলেও বিএসএফ ৩ দিন গড়িয়ে গেলেও সেই ৯ নাগরিককে ফিরিয়ে নেয়নি।
গয়টাপাড়ার বাসিন্দা ছক্কু মিয়া বলেন, “তিন দিন হয়ে গেছে, দুই দেশের কোনো সরকারই তাদের নিচ্ছে না। এরা চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সীমান্ত পর্যায়ে আলোচনা করে অসহায় বাচ্চা দুইটির মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার।”
রৌমারীর শৌলমারী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোনা মিয়া জানান, “কোলের বাচ্চাসহ লোকগুলো খুব কষ্টে খোলা আকাশে দিন কাটাচ্ছে। গরমে ঘামে বাচ্চা দুটি কাঁদছে। ঠিকমতো খাবার নাই, পানি নাই, টয়লেটের ব্যবস্থা নাই, অন্ধকার রাতে সাপ-বিচ্ছুর ভয়, মশার কামড়ে তাদের যায় যায় অবস্থা। বিএসএফও ফেরত নিচ্ছে না। সমাধান না হওয়ার কারণে এই বাচ্চাগুলোর বড় একটা বিপদ হয়ে যেতে পারে।”
৬ মাসের শিশুসহ পুশ ইনের শিকার ৬ জনকে দেখতে সারাদিনই ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু। টানা তিন দিন ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ৬ মাসের শিশুকে এভাবে আটকিয়ে রাখায় হতবাক সবাই।
ঘটনার পর থেকে গয়টাপাড়া, ভন্দুরচরসহ রৌমারী উপজেলা সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি, সেইসঙ্গে স্থানীয়রাও।
গয়টাপাড়া বিওপি ক্যাম্পের হাবিলদার মাসুদ রানা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, “মূলত রোববার সকাল ৭টার দিকে গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে ৬ জন এবং ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে ৩ যুবককে বাংলাদেশি সন্দেহে পুশ ইন করার চেষ্টা করলে বিজিবি এবং স্থানীয়রা বাধা দেন। পরে বাঁধার মুখে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ গজের ভিতরে সীমান্তের শূন্যরেখা লাগোয়া ভারতের অংশে অবস্থান নেয় তারা।”
জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান উদ্ভূত পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে, দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলমান রয়েছে।”
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন