প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আঙ্কারা সফরকে কেন্দ্র করে ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্কের প্রত্যাশা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মন্তব্য অনুযায়ী, এই সফরের মাধ্যমে তুরস্ক কিছু এফ-১১০ যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন সংগ্রহের পথে অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘকালীন টানাপোড়েনের বিষয়টি, বিশেষ করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি সম্পর্কিত বিরোধের সমাধান সম্ভাবনা নেই।
৭ ও ৮ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। সম্মেলনে সামরিক জোটের ৩২ সদস্য দেশের নেতারা উপস্থিত থাকবেন। ইস্তাম্বুল থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এই তথ্য জানিয়েছে।
গত মাসে, তুরস্কের এফ-১১০ যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন সংগ্রহ এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে ট্রাম্প জানান, তিনি এরদোগানকে 'খুব খুশি' করবেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এর অর্থ হতে পারে কেএএএন স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্পে প্রয়োজনীয় যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন সরবরাহের জন্য অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।
ইস্তাম্বুলভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইডামের পরিচালক সিনান উলগেন এএফপিকে বলেন, 'কেএএএন যুদ্ধবিমানের জন্য প্রায় ৪০টি এফ-১১০ জিই ইঞ্জিন সরবরাহে সবুজ সংকেত মিলতে পারে। কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল; তবে সেগুলো সম্ভবত দূর হতে শুরু করেছে।'
তিনি আরও জানান, 'তুরস্ক ইতোমধ্যে এফ-১১০ ইঞ্জিন ব্যবহার করে কেএএএনের দুটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে, যা উড্ডয়ন করছে। তবে আরও কেএএন প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য অতিরিক্ত ইঞ্জিন সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে।' কেএএএন হলো তুর্কির অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই) দ্বারা নির্মিত দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট একটি স্টেলথ যুদ্ধবিমান। এটি তুরস্কের বিমানবাহিনীর এফ-১৬ বহরের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াসহ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদনকারী দেশের কাতারে আঙ্কারার যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। যদিও ভবিষ্যতে এই যুদ্ধবিমানে তুরস্কের নিজস্ব তৈরি ইঞ্জিন ব্যবহৃত হবে। কারণ, এফ-১১০ ইঞ্জিনের স্টেলথ সক্ষমতা নেই। তবে তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের গত সেপ্টেম্বর মাসে জানান, দেশীয় ইঞ্জিন তৈরির প্রকল্প এখনও প্রাথমিক নকশা পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি গত সেপ্টেম্বর মাসে বলেন, 'তুরস্ক প্রথম দফায় ১০টি এফ-১১০ ইঞ্জিন পেয়েছে এবং আরও ৮০টি ইঞ্জিন সংগ্রহের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।' তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতি জোর দেওয়ার প্রেক্ষিতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত সেপ্টেম্বর মাসে বলেন, ২০১৭ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে রাজনৈতিক অনুমোদন না মেলার ফলে ইঞ্জিন সরবরাহ আটকা পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াশিংটন ২০১৯ সালে তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় এবং এক বছর পরে 'কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভার্সারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট' (ক্যাটসা) অনুযায়ী তুরস্কের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে দেশটির প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলো বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। ফিদান আরও উল্লেখ করেন, 'ক্যাটসা-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান জরুরি। এফ-৩৫ এবং কেএএএন; উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেএএএনের ইঞ্জিন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষমাণ।'
তুরস্কের এই বক্তব্য দেশটিতে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। কারণ, আঙ্কারা পূর্বে জানিয়েছিল যে, কেএএএন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হবে। এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ার ফলে তুরস্ককে আরও বেশি আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দিতে হয়েছে।
আঙ্কারায় জার্মান মার্শাল ফান্ডের প্রধান ওজগুর উনলুহিসারচিকলি বলেন, 'অনেকে মনে করেন, আমাদের এফ-৩৫ কেনা উচিত নয়। বরং সেই অর্থ নিজেদের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা উচিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন রপ্তানির সিদ্ধান্তে ঠিক সেটাই ঘটছে।' তিনি আরও বলেন, 'এই ইঞ্জিন ছাড়া তুরস্ক কেএএন যুদ্ধবিমান তৈরি করতে পারবে না।'
এফ-৩৫ ইস্যুতে অচলাবস্থা এখনও বহাল রয়েছে। কেএএন সরবরাহ শুরু হতে অনেক সময় লাগবে। এখনও পর্যন্ত মাত্র ইন্দোনেশিয়া ৪৮টি যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। তবে উলগেনের মতে, ন্যাটো সম্মেলনের পরে আরও কিছু দেশের আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি বলেন, 'জার্মানি-ফ্রান্সের এফসিএএস উদ্যোগের ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে কিছু দেশের আগ্রহ দেখা যেতে পারে। স্পেন সম্ভাব্য অংশীদার হতে পারে, এবং উপসাগরীয় দেশগুলোও আগ্রহী হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এটি বিশ্বাসযোগ্য প্রস্তাব হয়ে উঠতে হলে আরও অনেক বাধা অতিক্রম করতে হবে।'
বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করছেন, এফ-৩৫ নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনা কম৷ কারণ, ক্যাটসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য কংগ্রেসের সম্মতি প্রয়োজন এবং তুরস্কের এস-৪০০ ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলতে হবে, যেটি তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রির জন্য রাশিয়ার অনুমতি প্রয়োজন। আর রাশিয়াকে এই ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।
ইস্তাম্বুলের কাদির হাস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুস্তাফা আইদিন বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন হয়তো এ বিষয়টি পেছনে ফেলে তুরস্ককে কিছু এফ-৩৫ বিক্রি করতে চাইবে। তবে বিষয়টি কংগ্রেসে যাবে, এবং কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সহজ হবে না।'
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক এবং হোয়াইট হাউস ও পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ম্যাথিউ ব্রাইজা মনে করেন, ট্রাম্প যদি চান তবে এ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে পারেন। কারণ, এফ-৩৫ কর্মসূচি ছিল নির্বাহী সিদ্ধান্তের বিষয়, যা তিনি সহজেই পরিবর্তন করতে পারেন।
তিনি এএফপিকে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্যই ঘোষণা করতে পারেন যে, এস-৪০০ ও এফ-৩৫ বিরোধের অবসান ঘটেছে। তবে ক্যাটসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য কংগ্রেসের পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি কংগ্রেসকে রাজি করাতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে এ বিষয়ে তিনি কতটা রাজনৈতিক মূলধন ব্যয় করতে প্রস্তুত।'
তিনি মন্তব্য করেন, গ্রিক ও আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত তুরস্কবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ নেওয়া ট্রাম্পের জন্য 'রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল' হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন