প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের মেগা প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনার জন্য উত্তেজনা বাড়ছে। মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে সাজানো হচ্ছে ভারতের নিজস্ব হরমুজ প্রণালী হিসেবে। বিশ্লেষকদের বক্তব্য, এর পিছনে রয়েছে চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ভূকৌশলগত পরিকল্পনা।
গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অবস্থান ভূরাজনীতির দাবার বোর্ডে যেন চীনের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দূরে হলেও, অবস্থান সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা প্রণালীর একদম কাছে রয়েছে।
বেইজিংয়ের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এবং মোট বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশই এই রুটের মাধ্যমে ঘটে। তাই স্বাভাবিকভাবেই ১১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত এখানে নির্মাণ করছে বেসামরিক ও সামরিক বিমানবন্দর এবং গভীর সমুদ্র বন্দর, যা মালাক্কার ওপর দিল্লির নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে ইরান যেভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ফেলে, ভারতও গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ব্যবহার করে ভারত মহাসাগরে একই ধরনের কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার জন্য উদ্ভাবনী পরিকল্পনা করছে।
প্রকল্প প্রাথমিকভাবে, শুধুমাত্র সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মতো একটি বাণিজ্যিক হাব হিসেবে প্রবর্তন করা হলেও, এখন মোদি সরকার এর জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৌশলগত দিকগুলোকে সামনে নিয়ে আসছে।
নয়াদিল্লি-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন জানাচ্ছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে ভারতের এই ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানো অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত।
দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী পোর্ট ব্লেয়ার বর্তমান বিজয়া পুরমের ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ত্রি-সেবা যৌথ কমান্ডকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করবে। এই কারণে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে চীনকে চাপে রাখতে মালাক্কা প্রণালী অবরুদ্ধ করার একটি তাত্ত্বিক সুবিধা পাবে দিল্লি।
তবে, অনেক বিশেষজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তারা এই নৌ অবরোধের তত্ত্বটিকে আকাশকুসুম কল্পনা হিসেবে মন্তব্য করছেন। কারণ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিরাও সংকীর্ণ জলপথের নিশ্ছিদ্র অবরোধ রান করতে হিমশিম খায়, সেখানে ভারতীয় নৌবাহিনীর পক্ষে বিশাল ভারত মহাসাগরকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করা খুব কঠিন।
কৌশলগত এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীতে রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভয়াবহতা লুকিয়ে রয়েছে। বিরোধীরা বলছেন, এটাই উন্নয়নের নামে ধ্বংসের সূচনা। এই মেগা প্রকল্পের জন্য দ্বীপটির প্রায় ১৬ শতাংশ ভূমি ব্যবহার করা হবে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ মূলত আদিম যাযাবর উপজাতি শম্পেন ও স্থানীয় নিকোবরী সম্প্রদায়ের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
পরিবেশবিদ ও গণহত্যা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, এই প্রকল্পে প্রায় ১০ লাখ গাছ অপসারিত হবে এবং আগামী তিন দশকে এখানে সাড়ে তিন লাখ মানুষের কৃত্রিম বসতি তৈরি হবে। যা দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের জন্য এক প্রকার মৃত্যুদণ্ড বা আন্তর্জাতিক অপরাধের সমতুল্য।
এছাড়া, ২০০৪ সালের সুনামিতে ইন্দিরা পয়েন্টের চারপাশ যেভাবে তলিয়ে গিয়েছিল, সেটি সিসমিক জোন ৫ বা সর্বোচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকিতে অবস্থান করে এমন দ্বীপে ভারী অবকাঠামো নির্মাণের বিপদ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, বাণিজ্যিক লাভ এবং জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে অদ্ভুত এক সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে গ্রেট নিকোবরের ভবিষ্যৎ। বেইজিংকে আটকানোর এই মহাপরিকল্পনা ভারতকে বিশ্বমঞ্চে কতটা সুবিধা দেবে, তা সময়ই করবে প্রমাণিত। তবে, এর জন্য যে বৃহৎ প্রাকৃতিক এবং উপজাতীয় ঐতিহ্যকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে, সেটি ভবিষ্যতে ভারতের জন্য প্রতিরক্ষার চেয়েও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে কিনা, সেটাই এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন