প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের সংকট এখনো দূর হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও খাতটিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি।
বরং একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কয়েকটি বড় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে হাজারো শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আর্থিক সংকট, ক্রয়াদেশের সংখ্যা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদের ঋণ, জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং নীতি সহায়তার অভাবের কারণে অনেক কারখানা টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে আরো কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং কর্মসংস্থানের ওপর এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ঈদের পরবর্তী সময়ে পোশাক শিল্পাঞ্চলে ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এল। সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে প্রায় ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। শ্রমিকরা ঈদের ছুটি শেষে যখন কাজে যোগ দিলেন, তখন তারা জানতে পারেন তাদের চাকরি আর নেই।
শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের যথাযথ পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ছাঁটাই করা হয়েছে। অনেকেই বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, কিন্তু হঠাৎ চাকরি হারিয়ে এখন পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
অন্যদিকে, গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় অবস্থিত ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক এবং কর্মচারী একসঙ্গে কর্মহীন হয়েছেন।
দুই প্রতিষ্ঠানের ঘটনাগুলি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—পোশাক খাতের সংকট কি আরো গভীর হচ্ছে? শ্রমিকদের জীবনে অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে।
কারখানা বন্ধ বা ছাঁটাইয়ের ফলে শ্রমিকদের জীবনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়ছে। মাসিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার পরিবার একসাথে জীবিকার সংকটে পড়েছে।
গাজীপুরের ইউনিক ডিজাইনার্সে কর্মরত বিল্লাল সোহাগের মতো অনেক শ্রমিক জানেন না—আগামী মাসে তাঁদের সংসার কীভাবে চলবে। সন্তানদের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, ও দৈনন্দিন খরচ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন।
সাভারে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন কাজ করার পরেও তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কেউ কেউ বলছেন, অভিজ্ঞ শ্রমিকদের তুলনা অপেক্ষা বেশি মজুরি দিতে হয় বলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর কৌশল হিসেবে পুরনো শ্রমিকদের বাদ দিয়ে নতুন শ্রমিক নিয়োগের পদ্ধতি অবলম্বন করছে।
কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণের দিকে খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের প্রবৃদ্ধির কমতি ঘটেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ভোক্তা চাহিদার সংকোচনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে, পরিবহণ খরচ, ডলারের সংকট এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ফলে শ্রম ব্যয়ও বেড়েছে। যদিও শ্রমিকদের জন্য এটি ইতিবাচক, তবে উৎপাদনশীলতা না बढ़লে অনেক দুর্বল কারখানা অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সামলাতে পারছে না।
চতুর্থত, দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করছে বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিচ্ছে।
মহামারির সময় মহামারির পর তিন বছরে ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছিলেন, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেক কারখানা বর্তমানে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর ফলে স্থায়ী ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। উৎপাদন কমলেও ব্যাংক ঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল, ভাড়া এবং প্রশাসনিক ব্যয় নিয়মিত দিতে হচ্ছে। ফলে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে।
৬০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, আর্থিক সংকটই বর্তমানে কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, ‘রুগ্ন ও বন্ধপ্রায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার যে সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে, তা এখনও বাস্তবায়নে আসেনি। ফলে সংকটে থাকা কারখানাগুলো কোন ধরনের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে না।’
ত(এত) ধরনের প্রতিষ্ঠান যারা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত শনাক্ত করে বিশেষ সহায়তা প্রদান করতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থান সংকটে আরো প্রকট হতে পারে।
শ্রমিক নেতাদের ক্ষোভও রয়েছে। কারখানা বন্ধ এবং ছাঁটাইয়ের ঘটনাগুলোর মধ্যে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিদ্যমান। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইনের আওতায় শ্রমিকদের সব সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ও চাকরি-পরবর্তী নিরাপত্তার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়িক মন্দাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমানোর জন্য শ্রমিক ছাঁটাই করছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন এবং জীবিকা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।
বিষ্লেষকদের মতে, দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শ্রমিক নয়, সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঝুঁকিতে থাকা কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা। এই জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা, ব্যাংক ঋণে বিশেষ সুবিধা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ প্রয়োজন।
অন্যথায় একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শ্রমিকদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি হবে। যারা বছরের পর বছর ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে কাজ করেছেন, তারা আজ চাকরি হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন