প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এই দিনটিকে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন এক অগ্নিপর্বের সূচনা হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যে সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই একটি সীমিত সামরিক অভিযানের গণ্ডি পেরিয়ে দীর্ঘস্থায়ী, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত সংঘাতে রূপ নেয়। যে যুদ্ধকে কয়েক দিনের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে শেষ করার হিসাব কষা হয়েছিল, সেই যুদ্ধই আজ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক গভীর কৌশলগত চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে।
কারণ যুদ্ধ বিরতি লংঘন করে সম্প্রতি আবারো ইরানে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের ভয়াবহ ও স্মরনকালের মরণঘাতি বিধ্বংসী হামলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সদস্যদের মৃত্যু, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অনেক যুদ্ধবিমান, কোটি কোটি ডলার মূল্যের ড্রোন, সামরিক স্থাপনা, মাঝ আকাশে যুদ্ধবিমানকে তেল সরবরাহকারী রিফুয়েলিং ট্যাংকার, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ইরান প্রমাণ করছে - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের চোরাবালিতে পা দিয়েছে, যার পরিণতি -" যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি শক্তি প্রয়োগ করবে ততই তারা ইরানের পাল্টা আরো বিধ্বংসী ও ভয়াবহ হামলায় ধ্বংস ছাড়া আর কিছুই দেখবে না"-এখান থেকে যত দ্রুত সরে যাওয়া যায় ততই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মঙ্গল।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু করা সহজ, কিন্তু সেই যুদ্ধ থেকে সম্মান নিয়ে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক—প্রতিটি অধ্যায় একই শিক্ষা দেয়। কিন্তু মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে আবারও শক্তির অহংকারে এমন এক পথে হাঁটছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে আরও গভীরে টেনে নিচ্ছে।
ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করার যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। ধারাবাহিক পাল্টা হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে ইরান এমন একটি বার্তা দিয়েছে যে, এই যুদ্ধ আর একতরফা নয়। বরং প্রতিটি হামলার জবাবে পাল্টা আঘাতের নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে এমন এক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার সামরিক উপস্থিতিই অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে নতি স্বীকারে বাধ্য করে। কিন্তু বর্তমান সংঘাত সেই ধারণাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। যখন একটি রাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয় এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত করতে পারে, তখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলেও শক্তির ভারসাম্য বদলাতে শুরু করে।
আজ প্রশ্ন উঠছে—এই যুদ্ধের প্রকৃত লাভ কার? যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে অর্থনৈতিক ব্যয়, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক মেরুকরণ। যে সংঘাতকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনা ছিল, সেটিই এখন বহুস্তরীয় কৌশলগত সংকটে রূপ নিয়েছে।
বিশ্বে পরাশক্তির মর্যাদা শুধু অস্ত্রের শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা নির্ভর করে সিদ্ধান্তের প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচক্ষণতা এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার ওপর। যদি একটি যুদ্ধ ক্রমাগত দীর্ঘ হয়, ব্যয় বাড়তে থাকে এবং কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তবে সেই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সামরিক শক্তির নয়, কৌশলগত ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক যুদ্ধ। বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যার সামরিক ক্ষমতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু দীর্ঘায়িত প্রতিরোধ, পাল্টা আঘাত এবং সংঘাতের বিস্তার সেই ভাবমূর্তিকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তির ধারণা কখনো স্থির নয়; বাস্তবতার পরীক্ষায় তা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি কখনো সরল সমীকরণে পরিচালিত হয় না। এখানে প্রতিটি হামলার প্রতিক্রিয়া আছে, প্রতিটি কৌশলের পাল্টা কৌশল আছে এবং প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো শক্তিই স্থায়ী সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ের দাবি করা সহজ, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিচার করে—কে কতটা মূল্য দিয়েছে এবং কী অর্জন করেছে। যদি সংঘাতের মূল্য ক্রমাগত বাড়তে থাকে, আন্তর্জাতিক প্রভাব কমতে থাকে এবং কৌশলগত লক্ষ্য অধরাই থেকে যায়, তবে সেই যুদ্ধ বিজয়ের নয়, আত্মক্ষয়ের ইতিহাস হয়ে ওঠে।
সময়ই বলে দেবে এই সংঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যে যুদ্ধকে সহজ ভেবেছিল অনেকেই, সেটি আজ মধ্যপ্রাচ্যের বালুকণার মতোই অনিশ্চিত, অস্থির এবং বিপজ্জনক। আর চোরাবালির সবচেয়ে নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো—যত বেশি শক্তি প্রয়োগ করে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হয়, তত দ্রুতই আরও গভীরে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় যা যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক নীতি নির্ধারকেরা ইরানের গত কয়েকদিনে মহাপ্রলয়ের ধ্বংসলীলা ঘটানো হামলার মাধ্যমে টের পেয়েছে।
কাজেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের সিংহ খ্যাত ইরানের এই চোরাবালি থেকে যত দ্রুতই সরে পড়তে পারে তত-ই বাঁচবে কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মঙ্গল হবে, অন্যথায় হয়তো ইরানই হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংসের তথা বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারকারী মার্কিন মোড়লগিরির চূড়ান্ত পতন - এমন কথা আজকের দিনে বলা মনে হয় অমূলক হবে না।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন