প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাস্ট ফন্টেইন, মিশেল প্লাতিনি, জঁ-পিয়েরে পাপিন, থিয়েরি অঁরি, অলিভিয়ের জিরু - গত কয়েক দশকে ফুটবল বিশ্বের জন্য ফ্রান্সে অনন্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু গোল করার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের দিক থেকে অন্তত স্পষ্ট যে কিলিয়ান এমবাপ্পের তুলনায় কেউ এগিয়ে নেই, যা তিনি সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ উদ্বোধনী ম্যাচে গোল করার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। রিয়াল মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড অলিভিয়ের জিরুকে টপকে, এমবাপ্পে ফ্রান্সের ইতিহাসে সর্বকালের সর্ব্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে 'লে ব্লুজ'দের হয়ে ৫৮তম গোলটি করে, তিনি রেকর্ডবুকে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। বিবিসি ওয়ানে সেনেগালের সঙ্গে ফ্রান্সের ম্যাচের বিশ্লেষণে ফুটবল বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জিরু। তিনি বলেন, "অভিনন্দন কিলিয়ান। আমি অন্তত ওর জন্য খুব খুশি।" জিরু সিনিয়র ফুটবলার হিসেবে আরও বলেন, "এটা হওয়ারই ছিল, সবাই এটি-ই আশা করেছিল। ও সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেবে - ম্যাচ খেলার সংখ্যা এবং গোল, দুই দিক দিয়েই। আমার ধারণা, ও খুব সহজেই ১০০ গোল করতে পারবে এবং সম্ভবত মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপের রেকর্ডও ভেঙে দেবে। বিশ্বকাপ এবং বড় ম্যাচগুলোতে ও সবসময় দুর্দান্ত পারফর্ম করেছে।" এমবাপ্পে ৫৮টি গোল করেছেন মাত্র ৯৯টি ম্যাচে। মঙ্গলবারের ম্যাচে গোলের ফলে, তাঁর বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১৪তে পৌঁছেছে, যা জার্মান ফুটবলার মিরোস্লাভ ক্লোসারের ১৬ গোলের রেকর্ডের চেয়ে মাত্র দুটি কম। "অনেক সতীর্থ আমাকে তাঁর (এমবাপ্পে) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করে," যোগ করেন জিরু। "আমার কাছে এটা তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আত্মবিশ্বাসের ফল।" "ও জানে সে কোথায় পৌঁছাতে চায়। ও একজন নেতা এবং খুব অল্প বয়স থেকেই বোঝা যেত সে কতটা পরিণত। ও একজন দারুণ সতীর্থ, এক অবিশ্বাস্য প্রতিভা এবং মাঠে ও মাঠের বাইরে একজন প্রকৃত নেতা।" ফরাসি ফুটবল বিশেষজ্ঞ জুলিয়েন লরেন্স মনে করেন, এমবাপ্পে একদিন ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠবে। লরেন্স বলেন, "তার কাছ থেকে আরও অনেক কিছু পাওয়ার রয়েছে। কিন্তু যদি আমরা এখনই হিসাব করা বন্ধ করে দিই, তবে জিনেদিন জিদান এবং মিশেল প্লাতিনি অবশ্যই সর্বকালের সেরা দুই ফরাসি হিসাবে পরিচিত থাকবে।" এমবাপ্পে এরপর থিয়েরি অঁরি, আন্তোয়ান গ্রিজম্যান, অলিভিয়ের জিরু এবং অন্যান্যদের টপকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ স্থানে চলে আসবে। এমনকি, মৃক কোপার মতো পুরোনো প্রজন্মের তারকাদের চেয়েও সে এগিয়ে।" তিনি আরও বলেন, "এটা কেবল তাঁর গোলের জন্য নয়, বরং মাঠের অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব, ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার জন্য।" "আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি, ক্যারিয়ারের শেষে তিনি এক নম্বর হয়ে উঠবেন। এই বিশ্বকাপের পরেও তার সামনে অন্তত আরেকটি বিশ্বকাপ এবং ইউরো খেলার সুযোগ থাকবে। তাই সম্ভবত তিনিই হবেন আমাদের দেশের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়।" ২০১৭ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পরে, এমবাপ্পে ফ্রান্সের হয়ে চতুর্থ ম্যাচে প্রথম গোল করেন। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ৪-০ ব্যবধানে ফরাসিরা বিজয়ী হয়েছিল সেটি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ। একই দিনে, প্যারিস সেন্ট-জার্মেই ১৮ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারকে মোনাকো থেকে এক মৌসুমের জন্য ধারায় নিয়ে আসে। পরে ১৬৫.৭ মিলিয়ন পাউন্ডে স্থায়ীভাবে নেওয়ার বিকল্পসহ। পরবর্তীকালে প্যারিসের ক্লাবটি শর্ত পূরণ করে এবং এমবাপ্পেকে দলে নেয়, ফলে সে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কিশোর খেলোয়াড়ে পরিণত হয়। প্যারিসে যাওয়ার আগে তিনি ফরাসিদের কাছে জাতীয় নায়ক হয়ে ওঠেন। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের শিরোপা জয়েও তাঁকে প্রধান ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। ও বিশ্বকাপে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফরাসি খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত হন এবং পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করেন। রাশিয়া বিশ্বকাপে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তার পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার লাভ করেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তিনি ফ্রান্সের মূল ভরসা হয়ে ওঠেন। ওই সময় ২৩ বছর বয়সী এই তারকা আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টিতে হেরে যাওয়ার সত্ত্বেও, ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন। প্রজেক্ট এমবাপ্পে বাস্তবায়ন এমবাপ্পে এবং বিশেষত তাঁর পূর্ণ পরিবার সবসময়েই মনেপ্রাণে চেয়েছে যে তিনি যেন বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে পৌঁছাতে পারেন। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় 'প্রজেক্ট এমবাপ্পে'। বিবিসি স্পোর্টের 'এমবাপ্পে' নামের একটি তথ্যচিত্রে তাঁর ছোটবেলার বন্ধু রায়ান ভিয়াঙ্গা বলেন, "কিলিয়ানের জীবন ছিল শুধুই স্কুল আর ফুটবল। স্কুল, ফুটবল আর বাড়ি - ব্যস।" ১৯৯৮ সালে প্যারিসের উপকণ্ঠে বন্ডি এলাকায় এমবাপ্পের জন্ম ঘটে, যেহেতু ঠিক তার পাঁচ মাস আগে ফ্রান্স প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল। তাদের ফ্ল্যাট থেকে এএস বন্ডি ক্লাবের ফুটবল মাঠ দেখা যেত, যেখানে তাঁর বাবা উইলফ্রেড প্রথমে খেলোয়াড় এবং পরে কোচ হয়ে যুক্ত ছিলেন। ভিয়াঙ্গা বলেন, "কিলিয়ান এএস বন্ডির অন্য খেলোয়াড়দের চেয়ে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকত। সে তার বয়সের তুলনায় অনেক পরিণত ছিল এবং সবসময় সেরাদের সঙ্গে খেলতে চাইত। সেরাদের সঙ্গে খেলাটা ছিল তার জন্য একটি কঠোর নিয়ম।" লরেন্স আরও যোগ করেন, "ছোটবেলায় ও মাত্র তিন বছর বয়সে ফ্রান্সের জাতীয় সঙ্গীত 'লা মার্সেইয়েজ' মুখস্থ করেছিল, যাতে প্রথম ম্যাচ খেলার সময়ে ও এটি গাইতে পারে।" এমবাপ্পের মা, ফায়জা লামারি একজন সাবেক পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। ছোটবেলায় এমবাপ্পে নিজের ঘরের দেয়ালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ছবি লাগিয়ে রাখতেন এবং জিদানের ভিডিও দেখতেন। তবে, তাঁর ওপর বড় প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁর দত্তক ভাই জিরেস কেম্বো একোকো, যিনি এমবাপ্পের আগেই ক্লেয়ারফঁতেনের জাতীয় একাডেমিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং পরে রেঁনের হয়ে খেলতেন। লেখক ও ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষক ম্যাট স্পিরো বলেন, "শুরুর দিকে ক্লেয়ারফঁতেনে কিলিয়ানের সমস্যা হয়েছিল। দুই বছর সেখানে থাকার পর প্রথম বছরে সে তার গ্রুপের সেরা হতে পারেনি। সে উইংয়ে খেলত এবং প্রায়ই বিরক্ত থাকত।" প্রথম বছরের শেষের দিকে তার শারীরিক উচ্চতা হঠাৎ বৃদ্ধি পায় এবং দ্বিতীয় বছরে সে সত্যিই তার জাত চেনাতে শুরু করে। কিন্তু, এমবাপ্পের এই দ্রুত উত্থান মোটেও আশ্চর্যজনক ছিল না। মাত্র ১০ বছর বয়সেই বিখ্যাত ব্র্যান্ড নাইকি তাকে বিনামূল্যে বুট দেওয়ার জন্য চুক্তি করে। ছোটবেলা থেকেই ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর নজরে থাকা এই ফরোয়ার্ড মাত্র ১৪ বছর বয়সে প্যারিস ছেড়ে মোনাকোর এক জাঁকজমকপূর্ণ ক্লাবে যোগ দেন। চেলসি এবং রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে নেওয়ার চেষ্টা করলেও, এমবাপ্পের পরিবার জোর দিয়ে বলেছিল যে কিশোর বয়সে তাঁদের ছেলে ফ্রান্সেই থাকবে। ১৬ বছর ৩৪৭ দিন বয়সে কার বিরুদ্ধে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে, তিনি মোনাকোর ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হন, যা ১৯৯৪ সালে থিয়েরি অঁরির তৈরি রেকর্ড ভেঙে দেয়। তিন মাস পর, ত্রোয়ার বিরুদ্ধে নিজের প্রথম সিনিয়র গোল করে ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাও হন, যা অঁরির একটি আরেকটি রেকর্ড ভেঙে দেয়। লরেন্স বলেন, "মোনাকোতে যখন ওর অভিষেক হয়, তখনই বোঝা গিয়েছিল এই প্রতিভা কতটা অনন্য। আমাদের অনেক ভালো তরুণ প্রতিভা এসেছে, কিন্তু ওর মধ্যে বিশেষ কিছু ছিল।" অহংকারী কিশোর থেকে প্রকৃত নেতা মোনাকোতে যোগ দেওয়ার পরপরই, এমবাপ্পে এবং তাঁর সতীর্থদের একটি অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাদের নিজেদের ছবি দিয়ে একটি ম্যাগাজিনের কভার ডিজাইন করতে বলা হয়েছিল। বেশিরভাগ ছেলেই কোনো ক্রীড়া ম্যাগাজিন বা জাতীয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এমবাপ্পে কী বেছে নিয়েছিলেন, তা জানেন? তিনি বেছে নিয়েছিলেন বিশ্ববিখ্যাত 'টাইম ম্যাগাজিন'। আর তার দেওয়া শিরোনামটি ছিল - 'এল মায়েস্ত্রো' মানে 'ওস্তাদ'। এর ঠিক চার বছর পর, রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা এনে দিয়ে এবং পেলের পর দ্বিতীয় কিশোর হিসেবে ফাইনালে গোল করে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন তিনি। টাইমের প্রচ্ছদে সত্যিই তার ছবি জায়গা করে নেয় তখন। তার কম বয়সেই বৃহত্তর চিত্র দেখতে পারার ক্ষমতাই 'প্রজেক্ট এমবাপ্পে' শব্দটির জন্ম দেয়। ২০১৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পিএসজিতে যোগ দিয়ে এমবাপ্পে বিশ্বের সবচেয়ে দামী কিশোর খেলোয়াড় হন। রিয়ালকে সেসময় তার জন্য আরও সাত বছর অপেক্ষা করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই, এত প্রত্যাশার সঙ্গে অহংও আসে। "সাফল্যের জন্য অহং এক ধরনের প্রেরণা," বলেছিলেন পিএসজির সাবেক পারফরম্যান্স পরিচালক মার্টিন বুচেইত। "কিন্তু সেটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। কিলিয়ানের পক্ষে সব সময় সেটা সম্ভব হয়নি। তবে, তার পরিবার - মা-বাবা সবসময় তার পাশে ছিল।" ২০২৩ সালে দিদিয়ের দেশঁ তাকে ফ্রান্সের অধিনায়ক ঘোষণা করেন। এখনও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা হয়নি, ব্যালন ডি'অরও তিনি পাননি, তবুও মনে হচ্ছে 'প্রজেক্ট এমবাপ্পে'র পথচলা এখনো বাকি। "সে খুবই আত্মকেন্দ্রিক, কিন্তু অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর সে যেন জানতো তাকে প্রকৃত নেতা হতে হবে," বলেন লরঁ। "শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট নয়, আমি অবাক হব যদি সে ব্যালন ডি'অর এবং অন্তত একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ না জিতে ক্যারিয়ার শেষ করে।" "ট্রফির দিক থেকে তার অর্জন জিদান ও প্লাতিনির চেয়ে বড় হবে - আর গোলের রেকর্ড তো হবেই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন