প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ভারত ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারির নতুন পর্বে উন্নয়ন সহযোগিতার আওতায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২ জুলাই ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকের যৌথ ঘোষণায় উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) শক্তিশালী করার পরিকল্পনায় বাংলাদেশসহ বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে অনুষ্ঠিত এ ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এ বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যের কথা জানানো হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য উভয় দেশ একমত হয়েছে। এ অঞ্চলে শিল্প উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের মাধ্যমে একটি সমন্বিত শিল্প ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বিমসটেকের সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল এবং ভুটান। যদিও যৌথ বিবৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে বাংলাদেশ হয়ে সমুদ্রবন্দর এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাই মূল লক্ষ্য। এর আগে ২০২৩ সালে তৎকালীন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা ভারত সফরে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশকে সংযুক্ত করে শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের একটি বৃহৎ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে পোর্ট, সড়ক ও রেল অবকাঠামো ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সর্বশেষ শীর্ষ বৈঠকের সিদ্ধান্তে সেই ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে পুরো বিমসটেক অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি শীর্ষ বৈঠক-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে বলেন, জাপানের কাছে উত্তর-পূর্ব ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ক্ষেত্র। এ অঞ্চলের উন্নয়নে দুই দেশের চলমান সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে। এসময় উত্তর-পূর্ব ভারতকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আরও কৌশলগত গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, সড়ক এবং রেল করিডর ও সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য নতুন মাত্রা পেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন বাড়বে। বন্দর, লজিস্টিকস ও পরিবহন খাতে নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ আরও গভীর হবে। বিমসটেকভিত্তিক আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল গড়ে ওঠার সুযোগও সৃষ্টি হবে। জাপানের অর্থায়নে নতুন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বাড়বে। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অঞ্চল। এ কারণে জাপান দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ভারত-জাপান শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামোয় যুক্ত করার বিষয়টি তাই নতুন কোনো উদ্যোগ নয়; ২০২৩ সালেও এ ধরনের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ তখনই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত হবে, যখন এ উদ্যোগ কেবল उत्तर-পূর্ব ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মিয়ানমারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ আরও জোরদার করবে। কারণ বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার ও আঞ্চলিক সংযোগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব উত্তর-পূর্ব ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। শাহাব এনাম খান আরও বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে যদি ভারত, জাপান ও বাংলাদেশ যৌথভাবে শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারে, তাহলে তা তিন দেশের জন্যই ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করবে। তাঁর মতে, জাপানের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদার হলে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বাড়বে। তাই ভবিষ্যতে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন